Logo

সারাদেশ

১৫ লাখের বেশি পরিবার বিএমডিএর উপকার ভোগী

Icon

সাপাহার (নওগাঁ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২০:২৩

১৫ লাখের বেশি পরিবার  বিএমডিএর উপকার ভোগী


উত্তরবঙ্গের কৃষক, মাটি ও পানির সাথে বেশি সম্পর্ক রয়েছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ)। প্রায় ১৫ লাখের বেশি পরিবার এই সরকারি সংস্থাটির সাথে জড়িত। মানুষ, মাটি ও পানির নাড়ীর সেতু বন্ধন বিএমডিএ দিয়ে হলে এলাকা দেশ মানুষ প্রকৃতি ভারসাম্য থাকবে বলে জানিয়েছেন উপকার ভোগী মানুষ ও বিএমডিএ।

নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলার বড় মির্জাপুর গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জাব্বার (৭০) বলেন, উত্তর বাংলাদেশে ফসল এনে দিয়েছে প্রয়াত চেয়ারম্যান ও নির্বাহী পরিচালক ড. এম আসাদুজ্জামান। তিনি বিএমডিএ প্রতিষ্ঠিতি না করলে  হয়তো বাংলাদেশ আরো বহুদিন পিছিয়ে থাকতো। বাংলাদেশ বেশির ভাগ খাদ্য উত্তরবঙ্গ থেকে উৎপাদিত হয়। তার প্রতিষ্ঠিতি এলাকার রাস্তা-ঘাট, গভীর নলকূপ, খালখনন, সুপেয় পানি সরবরাহ, সোলারপ্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী কাজ করে। এছাড়াও বহু ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। তাই তাদের দিয়ে খাল খননসহ কৃষিকাজের উন্নয়নমূলক তাদের হাতে ন্যাস্ত রাখা উচিত।

তিনি বলেন, বিএমডিএ বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় কৃষি ও পরিবেশগত বিবর্তনে এক বিপ্লব ঘটিয়েছে। এক সময় এই জেলা ছিল অত্যন্ত শুষ্ক এবং কৃষির জন্য অনুপযোগী। বিএমডিএ’র প্রচেষ্টায় আজ তা দেশের অন্যতম প্রধান শস্য ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে। ১৯৮৫ সালে অত্র অঞ্চলে বরেন্দ্র প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও ১৯৯১-৯২ সনে বিএনপি সরকারের আমলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিএমডিএ নামে এই সরকারী প্রতিষ্ঠান জন্ম লাভ করে।

রাজশাহী জেলার গোড়াগাড়ী উপজেলার কদমশহর গ্রামের বাসিন্দা মো. মামুন সরকার বলেন, শুধু খাল নয় পানির উন্নয়নের কাজ বরেন্দ্রকে(বিএমডিএ ) দিয়ে করালে সঠিকভাবে কাজটি হবে। কেন বলি, আমরা দেখছি মরুময় এলাকা থেকে এলাকাকে সবুজ প্রকৃতি করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। তাদের বাস্তব জ্ঞান রয়েছে। 

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার নেজামপুরের বাসিন্দা আব্দুল আওয়াল (৬০) বলেন, প্রতিদিন সকাল হলেই বিএমডিএ -এর সরবরাহ করা পানি পান, জমি, বাগান ইত্যাদিতে ব্যবহার শুরু হয়। ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত একই নাম জপতে হয় বলতে পারেন। তাই তাদের দিয়ে কৃষির উন্নয়নের স্বার্থে খাল খনন তথা পানির ব্যবস্থাপনার কাজ করালে কৃষির উন্নয়ন হবে।

বিএমডিএ’র চাঁপাইনবাবগঞ্জ রিজিয়ন কার্যালয় থেকে প্রাপ্ততথ্য, বিএমডিএ বরেন্দ্র এলাকার মরু প্রায় জমিকে সেচের আওতায় এনে চাষযোগ্য করার জন্য ১৬৩৯টি ফোর্স মোড পাম্প স্থাপন করেছে।  ফলে যেসব জমিতে আগে বছরে মাত্র একটি ফসল হতো, সেখানে এখন প্রতি বছর প্রায় ৬২০০০ হেক্টর জমিতে তিনটি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে এবং এতে প্রায় ১,৩২,০০০ কৃষক পরিবার উপকৃত হচ্ছে। শুধু মাটির নিচের পানি নয়, বরং নদী ও খালের পানিকে পাম্পের মাধ্যমে তুলে সেচ কাজে ব্যবহারের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে এবং অদ্যাবধি ৮৮টি এলএলপি মহানন্দা নদী, পুনর্ভবা নদী ও বিভিন্ন খালে স্থাপনের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৩০০০ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করেছে এবং প্রায় ১২০০০টি কৃষক পরিবার উপকৃত হচ্ছে।বিএমডিএ’র সেচযন্ত্রের আওতায় প্রতি বছর ৬,৫০,০০০ মে:টন ফসল উৎপাদন হয় যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ১৬২৫ কোটি টাকা। সকল সেচযন্ত্রে সেচ কাজে পানির অপচয় রোধে এবং কৃষকদের বিল পরিশোধ সহজ করতে বিএমডিএ প্রথম স্মার্ট কার্ড ভিত্তিক প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থা চালু করে, যা কৃষি খাতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।


বরেন্দ্র এলাকার মরুময়তা রোধ এবং জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় বিএমডিএ সড়ক/রাস্তার দুই পাশে, পুনঃখননকৃত খালের ও পুকুর পাড়ে এবং পতিত জমিতে প্রায় ১.৫০ কোটি ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করেছে। এটি এলাকার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ২.৩০কিঃমিঃ খাস মজা খাল এবং ১০৯১ টি পুকুর পুনঃখনন করা হয়েছে। এতে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর চাপ কমছে এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাচ্ছে। এছাড়া খরা মৌসুমে কৃষকেরা পুকুর হতে সমপূরক সেচ সুবিধা গ্রহণ করছে। কৃষি ও পরিবেশের পাশাপাশি বিএমডিএ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নেও কাজ করেছে। বিএমডিএ সেচের গভীর নলকুপ হতে ২৩৪ টি সুপেয় খাবার পানি সরবরাহ স্থাপনা নির্মান করেছে। ইহাতে অত্র জেলায় প্রায় দুই লাখ মানুষের খাবার পানি নিশ্চিত হয়েছে।বিএমডিএ কর্তৃক প্রায় ১৪০০ কিঃমিঃ বারিড পাইপের সেচ নালা নির্মাণের পাশাপাশি ওই এলাকায় যাতায়াতের জন্য প্রায় ১৮৬ কিঃমিঃ সংযোগ পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে, যার ফলে কৃষকরা সহজেই তাদের পণ্য বাজারে নিতে পারছেন।সেচ সম্প্রসারণ আগে বরেন্দ্র এলাকার উঁচু জমিতে আম বাগান করা কঠিন ছিল। বিএমডিএ-র গভীর নলকূপের ফলে এখন বাগানগুলোতে নিয়মিত সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, যা ফলন কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক জায়গায় পানির অপচয় রোধে ফোঁটা ফোঁটা সেচ বা ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতি জনপ্রিয় করতে বিএমডিএ কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। এর ফলে বরেন্দ্র এলাকায় ধান, গম,সরিষা, ভুট্টা এবং আম উৎপাদনের যে জোয়ার এসেছে, তা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিএমডিএ বড় ভূমিকা রাখছে।

বিএমডিএর চাঁপাইনবাবগঞ্জ রিজিয়ন কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আল মামুনুর রশীদ বলেন, চলতি বছরে বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষ মহানন্দা নদীর পানি উঁচু বরেন্দ্র অঞ্চলে নদী হতে প্রায় ১৭-১৮ কিঃমিঃ দুরে প্রায় ৮০-৯০ ফুট উঁচু  প্রায় ১৮০০০ হেঃ তীব্র পানি সংকট এলাকায় পানি সরবরাহসহ চাষাবাদের জন্য ২টি প্রকল্প প্রস্তাব কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছে । যার একটি হলো ”ডাবল লিফটিং পদ্ধতিতে মহানন্দা নদীর পানি সেচ কাজে ব্যবহার ও পরিবেশ উন্নয়ন প্রকল্প” এবং এর সম্ভাব্য প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৩৯ কোটি টাকা। অপর প্রকল্পটি হলো “জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব প্রশমনে মহানন্দা নদী হতে ভূ-পরিস্থ পানি সরবরাহের মাধ্যমে খরা প্রবণ বরেন্দ্র এলাকায় সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ প্রকল্প”এবং এর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৮৭ কোটি টাকা।এই ২টি প্রকল্পের আওতায় নদীতে স্থায়ী পাম্প স্টেশন স্থাপনসহ প্রায় ২১০ কিঃমিঃ খাস খাল/খাড়ী ও ১৫০ টি খাস পুকুর পুনঃখনন , প্রায় ৫.৫০ লক্ষ বৃক্ষ রোপন ,২৭৫টি সোলার সেচ যন্ত্রপাতি স্থাপন,৩৩৫ কিঃমিঃ বারিড পাইপ লাইন নির্মান ও অন্যান্য কাজ করা হবে। এছাড়া বর্তমানে চলমান ২টি প্রকল্পের আওতায় অত্র জেলায় ৬কিঃমিঃ খাল,২টি বিল (বিল চুড়ইল ১১৫ একর, বিল কালন ১২৭ একর) ও ১৪৫ টি পুকুর পুনঃখননের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বর্তমান সরকার যদি এই প্রতিষ্ঠানকে আরো শক্তিশালী করে তাহলে অত্র এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিএমডিএ আরো ভূমিকা পালন করতে থাকবে।

বিএমডিএ থেকে প্রাপ্ততথ্য, বিএমডিএ মোট ২৬৬১ কিলোমিটার খাল খনন করেছে। বিল খনন করেছে ১০ টি। পুকুর খনন করেছে ৪ হাজার ৩৬৪টি। উপকার ভোগী ১৫ লাখের বেশি পরিবার রয়েছে। 

বিকে/মান্নান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন