ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে যানজট কমাতে ও উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্যের দ্রুত সরবরাহ করতে বগুড়া-জামালপুর নৌরুটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মানের দাবি দীর্ঘ দিনের। এই সেতু নির্মাণ হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারসহ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে এই অঞ্চলে। একই সাথে শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবা গ্রহনকারীদের রাজধানীর সাথে যোগাযোগ সহজ হবে।
এজন্য যমুনা নদীর ওপর নির্মিতব্য দ্বিতীয় যমুনা সেতু বগুড়ার সারিয়াকান্দি এবং জামালপুরের মাদারগঞ্জ রুটে নির্মাণের জন্য জাতীয় সংসদে জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। উত্তরবঙ্গের সাথে রাজধানী ঢাকা ও ময়মনসিংহের দূরত্ব কমিয়ে আনতে এবং অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটাতে এই রুটটিকে সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে উল্লেখ করেছেন জনপ্রতিনিধিরা।
যমুনায় দ্বিতীয় সেতুটি নির্মিত হলে বগুড়া থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ৭০/৮০ কিলোমিটার কমে আসবে এবং প্রথম সেতুর চাপ কমবে। এটি বাস্তবায়ন হলে বগুড়া-জামালপুর এলাকাবাসীর শতবছরের স্বপ্ন পূরুণ হবে। এদিকে বিকল্প পথে বাসযোগে সিরাজগঞ্জ হয়ে ১৮৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ময়মনসিংহ যাতায়াত করতে হচ্ছে। জেলাবাসী বলছেন, বগুড়ার কৃতি সন্তান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিতীয় যমুনা সেতুটি নির্মান করে এলাকাবাসীর স্বপ্ন পূরুণ করবেন।
জানা গেছে, ১৯৩৮ সালে তিস্তামুখ থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ রেলঘাট পর্যন্ত নৌপথে ফেরি চলাচল শুরু হয়। এই নৌপথে রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী ও বগুড়া জেলার বাসিন্দারা বাহাদুরাবাদ স্টেশন থেকে ট্রেনে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহের জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ যাতায়াত করতেন। পরে সত্তর দশকে সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুর নৌরুটে ফেরি সার্ভিস চলমান ছিল। তখন নৌপথেই উত্তরাঞ্চলের লোকজন বৃহত্তর ময়মনসিংহ বিভাগে চলাচল করতেন। সময়ের পরিক্রমায় ১৯৮৮ সালের বন্যায় এবং যমুনা নদীর ভাঙনে যমুনা তার গতিপথ পরিবর্তন করে। ফলে এ নৌরুট থেকে ফেরি সার্ভিস প্রত্যাহার করে গাইবান্ধার বালাসি ঘাটে স্থানান্তর করা হয়।
এরপর থেকেই বগুড়া সারিয়াকান্দির কালিতলা নৌঘাট থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জ নৌরুটে নৌকা দিয়েই যাত্রীরা চলাচল করতে শুরু করেন। বর্তমানে এ নৌপথে প্রতিদিন হাজারো যাত্রী চলাচল করছেন নৌকা যোগে। তাছাড়া বর্তমানে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে ময়মনসিংহ যাতায়াতে প্রায় ১৮৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। সারিয়াকান্দি দিয়ে সেতু নির্মিত হলে এই দূরত্ব সরাসরি ৮০ কিলোমিটার কমে যাবে। বিদ্যমান যমুনা সেতুর ওপর চাপ কমবে এবং উত্তরবঙ্গের যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হবে না। যমুনার দুই তীরের চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলে যাবে। বিশেষ করে কৃষি পণ্য পরিবহনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। উত্তরবঙ্গের চাল, সবজি এবং পাথর সরাসরি ময়মনসিংহ বিভাগ ও সিলেটে দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হবে। এই নৌপথে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দাবি এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের।
এদিকে গত ২০২২ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ১৯ সদস্যের জরিপ দল সারিয়াকান্দির কালিতলা ঘাট থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জের জামথল ঘাট পর্যন্ত যমুনা নদীতে সেতু নির্মাণের জন্য ট্রাফিক সার্ভে শেষ করেন।
সম্প্রতি সেতু বিভাগ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি বৈঠকে ৩টি মেগা প্রকল্পের তথ্য পাওয়া যায়। সেতু বিভাগের মাষ্টার প্লান অনুযায়ী যমুনা সেতুর উপর চাপ কমাতে এই নদীর উপর দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। এ লক্ষ্যে বর্তমানে ৩টি সম্ভাব্য রুটের উপর সমীক্ষা চলছে। এগুলো হলো বগুড়া থেকে জামালপুর করিডোর, গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ঘাট অথবা অন্য কোনও উপযুক্ত রুট। তবে সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মিত হলে উত্তরের মানুষের সঙ্গে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার যোগাযোগ নিরবচ্ছিন্ন হবে।
ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী বগুড়ার তানভীর হাসান জানান, বগুড়া থেকে সারিয়াকান্দি হয়ে নৌকা যোগে ময়মনসিংহ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া খুবই কষ্টকর। তাই সেতুটি নির্মান হলে সহজেই যাতয়াত করা যাবে।
বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাইরুল ইসলাম জানান, জামালপুর এবং বগুড়ার মধ্যে সরাসরি সংযোগ এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। এ প্রত্যাশা পূরুণ হলে উত্তরাঞ্চলের সাথে ময়মনসিংহ বিভাগের মানুষের মধ্যে ব্যবসা-বানিজ্যের বিপ্লব ঘটবে।
বগুড়া-১ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, দ্বিতীয় যমুনা সেতু বগুড়ায় চেয়ে গত রবিবার (২৭ এপ্রিল) সংসদে প্রস্তাব উপস্থাপন করেছি। বগুড়া সারিয়াকান্দির যমুনাতে বিকল্প সেতুটি হলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজসহ সকল ধরণের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার হবে। প্রায় ৭০ কিলোমিটার সড়কের দূরত্ব কমবে এবং উত্তরবঙ্গের মানুষের সময় এবং অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে। যমুনা সেতুর ওপর চাপ কমবে এবং যানজট নিরসন হবে।
বিকে/মান্নান

