Logo

সারাদেশ

ফতুল্লায় দগ্ধ একই পরিবারের ৫ জনকে পাশাপাশি দাফন

Icon

পটুয়াখালী প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ১৫:১৯

ফতুল্লায় দগ্ধ একই পরিবারের ৫ জনকে পাশাপাশি দাফন

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গ্যাসের পাইপের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একে একে নিভে গেল একই পরিবারের পাঁচ প্রাণ। এই বিস্ফোরণের আগুনে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পর্যায়ক্রমে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন স্বামী, স্ত্রী ও তাদের তিন সন্তান।

শনিবার (১৬ মে) সকালে যখন মা সালমা বেগম (৪০) একমাত্র ছেলে মুন্না (১২), দুই মেয়ে মুন্নী (৯) ও কথার (৭) সাদা কফিনে মোড়ানো মরদেহ পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার উত্তর কনকদিয়া গ্রামের কাড়াল বাড়িতে পৌঁছায়, তখন পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

এর আগে গত সোমবার সকালে দাফন করা হয় গৃহকর্তা কালাম মিয়াকে (৫০)। আজ নতুন বাড়ির পুকুরপাড়ে কামাল মিয়ার কবরের ঠিক পাশেই বাকি চারজনকে শায়িত করা হয়েছে। একই সারিতে পাশাপাশি পাঁচটি তাজা কবরের দিকে তাকিয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলেন শত শত মানুষ।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কালাম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকায় কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে ভুইগড় এলাকার একটি ১০ তলা ভবনের নিচতলায় ভাড়া থাকতেন তিনি। গত রবিবার (১০ মে) সকাল ৬টার দিকে কালাম মিয়া গ্যাসের চুলায় তরকারি গরম করতে যান। তখন স্ত্রী ও সন্তানরা ঘুমে ছিলেন। ঘরে আগে থেকেই জমে থাকা গ্যাস আগুনের সংস্পর্শে আসতেই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তেই পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। জ্বলন্ত আগুনের মধ্যেও কালাম মিয়া ঘরের দরজা খুলে দগ্ধ ছেলে মুন্নাকে বাইরে বের করে দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে কামালের স্ত্রী ও দুই মেয়ে আগুনে দগ্ধ হয়ে যায়।

পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিস তাদের উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করেন। সেখানে পর্যায়ক্রমে তাদের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার দিনই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কালাম মিয়া। এর পর বুধবার বিকেল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ৭ বছরের শিশু কথা। মায়ের কোল খালি করে চলে যাওয়া কথার মরদেহ রাখা হয় হাসপাতালের হিমাগারে।

বুধবার রাত ১১টায় বোনকে হারানোর কয়েক ঘণ্টার মাথায় বৃহস্পতিবার সকালে মারা যায় একমাত্র ছেলে মুন্না (১২)। একইদিন বিকেলে না ফেরার দেশে চলে যায় মেঝ মেয়ে মুন্নী (৯)। শুক্রবার সকাল ৮টায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন মা সালমা বেগম (৪০)।

শনিবার সকালে যখন মা ও তিন সন্তানের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি কাড়াল বাড়ির উঠানে এসে থামে, তখন উপস্থিত শত শত মানুষের চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। শেষবারের মতো একনজর দেখতে আসা মানুষের ভিড়ে চারপাশ থমকে যায়। এরপর সকাল ১০টায় জানাজা শেষে কামাল মিয়ার কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তার স্ত্রী ও সন্তানদের।

কালাম মিয়ার চাচাতো ভাই সোহাগ বলেন, ‘প্রায় ২০-২২ বছর আগে কামাল বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে উজিরপুরে বিয়ে করেছিল। কত কষ্ট করে ফতুল্লার ব্যবসাটা দাঁড় করাল। মাত্র ২০-২৫ দিন আগেও ঢাকায় ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। ভাবতেই পারছি না, ভাই-ভাবি আর পুলাপাইনডি এভাবে আমাদের ছেড়ে এক্কেরে চলে যাবে।’

কালাম মিয়ার বোন রাসেদা বেগম বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ‘ঈদের আগে ভাইয়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল। বাড়িতে ভাইয়েরা মিলে একটি নতুন বিল্ডিংয়ের কাজ ধরছিল। ভাই বলছিল এবার কোরবানির ঈদে বাড়ি আইসা ঘরের কাজ শেষ করমু, বাকি জীবনটা স্ত্রী-সন্তান নিয়া দেশের বাড়িতেই থাকমু। ভাই আমার বাড়ি ফিরল, কিন্তু লাশ হয়া!’

এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে ভবন কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন কালামের এক স্বজন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাসার গ্যাসের পাইপ লিকেজ হওয়ার বিষয়টি কালাম মিয়া আগের দিনই ভবনের দারোয়ানকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু দারোয়ানের অলসতা করে বাড়ির মালিককে বিষয়টি জানায়নি। যদি সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তবে আজ একটি পুরো পরিবার হয়ত এভাবে শেষ হয়ে যেত না।‘


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন