কোরবানির বাজার ধরতে প্রস্তুত চট্টগ্রামের কামারপল্লী
আ ন ম সানাউল্লাহ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ২০:৫৪
ঈদুল আজহা মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। আর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী কামারপল্লীগুলোতেও শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। তবে এখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি কোরবানির মৌসুমের ব্যস্ততা। ধীরে ধীরে বাড়ছে অর্ডার, বাড়ছে ক্রেতাদের আনাগোনা। কামাররা বলছেন, ঈদের আর কয়েকদিন বাকি থাকলেও সামনে অপেক্ষা করছে টানা কর্মব্যস্ত সময়।
সরজমিনে নগরীর চকবাজার, বহদ্দারহাট, কোরবানীগঞ্জসহ বিভিন্ন কামারপল্লী ঘুরে দেখা যায়, কোথাও আগুনের ভাটিতে লোহা পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে দা, ছুরি, চাপাতি ও বটি, আবার কোথাও পুরনো সরঞ্জামে শান দিচ্ছেন কারিগররা। কিছু দোকানে কোরবানির সরঞ্জাম সাজিয়ে রাখা হলেও এখনো বড় ধরনের ভিড় দেখা যায়নি।
চকবাজার এলাকার কামার আবদুল কাদের প্রায় ২৫ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন,“কোরবানির সময়টাই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম। এখনো পুরো চাপ শুরু হয়নি। তবে প্রতিদিন অর্ডার বাড়ছে। ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকে দিন-রাত কাজ করতে হবে।”
তার পাশেই কাজ করছিলেন তরুণ কারিগর রুবেল। আগুনে লোহা গরম করে হাতুড়ির আঘাতে ছুরির আকার দিচ্ছিলেন তিনি। রুবেল বলেন,
“আমাদের কাজটা অনেক কষ্টের। আগুনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকতে হয়। তারপরও এই সময়ের আয় দিয়েই পরিবারের অনেক খরচ চলে।”
বহদ্দারহাট এলাকার কামার মোহাম্মদ ইদ্রিস জানান, আগের তুলনায় এখন দেশীয় কামারশিল্প কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। বাজারে বিদেশি ও কারখানায় তৈরি সরঞ্জামের আধিপত্য বেড়েছে। তবুও অনেক মানুষ এখনো হাতে তৈরি দেশীয় দা ও ছুরির ওপর ভরসা করেন।
তিনি বলেন,“বিদেশি ছুরি দেখতে সুন্দর হলেও আমাদের তৈরি জিনিস বেশি টেকসই হয়। অনেক ক্রেতা এখনো হাতে বানানো দা-ছুরি খোঁজেন।”
কোরবানীগঞ্জ এলাকার প্রবীণ কামার নুরুল আলম বলেন, “আগে কোরবানির ঈদের সময় দোকানে দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়া যেত না। এখন সেই ভিড় কমেছে। তারপরও মানুষ পুরনো ছুরি ধার দিতে আসে, নতুন চাপাতিও নেয়।”
তিনি জানান, বর্তমানে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচও অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে লোহা, কয়লা ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ছোট কারিগররা টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন।
আরেক কারিগর শাহজাহান বলেন, “আগে যে লোহা ৭০-৮০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটার দাম অনেক বেশি। কয়লার দামও বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে আমরা দাম বাড়াতে পারি না।”
সরজমিনে দেখা যায়, অনেক দোকানে পুরনো দা, ছুরি ও চাপাতি ধার দেওয়ার কাজও শুরু হয়েছে। কোরবানির আগে অনেকে নতুন সরঞ্জাম কেনার পরিবর্তে পুরনো জিনিস শান দিয়ে ব্যবহার করতে চান। কামাররা জানান, ঈদের শেষ সপ্তাহে ধার দেওয়ার চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। তখন রাতভর কাজ করতে হয়।
ক্রেতা আবুল বাশার বলেন, “কোরবানির জন্য ভালো মানের ধারালো ছুরি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা স্থানীয় কামারদের কাছ থেকেই কিনতে পছন্দ করি।”
আরেক ক্রেতা সাইফুল ইসলাম জানান, হাতে তৈরি দেশীয় চাপাতি ও দা এখনো অনেক বেশি কার্যকর। “দেশীয় কামারদের কাজের আলাদা একটা মান আছে,” বলেন তিনি।
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী এই কামারশিল্প শত বছরের পুরনো। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিদেশি পণ্যের চাপে অনেক কামারপল্লী হারিয়ে যেতে বসেছে। তারপরও কোরবানির ঈদ এলেই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পান এই পেশার মানুষগুলো। আগুনের ঝলকানি, ধোঁয়ার কুণ্ডলী, লোহায় হাতুড়ির আঘাত আর কর্মব্যস্ত মানুষের ছুটে চলায় আবারও জেগে উঠছে চট্টগ্রামের কামারপল্লী।
কামারদের আশা, ঈদের শেষ মুহূর্তে জমে উঠবে বেচাকেনা। তখন আবারও আগুনের উত্তাপ আর হাতুড়ির শব্দে মুখর হয়ে উঠবে নগরীর ঐতিহ্যবাহী কামারশালাগুলো।
বিকে/মান্নান

