দিনাজপুরে
কৃত্রিম সংকট আর সিন্ডিকেটের কারসাজিতে চালের বাজারে আগুন
আব্দুস সালাম, দিনাজপুর
প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ২১:০০
চারিদিকে সোনালী ধানের ম ম গন্ধ, ইরি-বোরো মৌসুমের এই ভরা সময়ে যেখানে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে তৃপ্তির হাঁড়ি চড়বার কথা, সেখানে দেশের অন্যতম প্রধান শস্যভাণ্ডার দিনাজপুরে উল্টো কান্নার রোল উঠেছে। প্রকৃতির অকৃপণ দানের পরও এক অদৃশ্য ও কৃত্রিম সংকটের আগুনে পুড়ছে চালের বাজার। ভরা মৌসুমেও চালের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৫০ কেজির প্রতি বস্তা চালের দাম আকাশচুম্বী হয়ে বেড়েছে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত।
নিত্যপণ্যের এই লাগামহীন ঊর্ধ্বমুখীতায়
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন এ অঞ্চলের খেটে খাওয়া, সাধারণ মানুষ। আয়ের খাতায় নতুন কোনো
অঙ্ক যোগ না হলেও, ব্যয়ের বোঝা প্রতিদিন ভারী হচ্ছে। চালের বাজারের এই উত্তাপের পেছনে
উঠে এসেছে মূলত চারটি প্রধান সংকট ধানের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের চড়া
দাম, বিদ্যুতের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি এবং তীব্র লোডশেডিং। এই চতুর্মুখী সংকটের যাঁতাকলে
পিষ্ট হয়ে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, যার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে
সাধারণ ভোক্তাকে।
দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী বাহাদুরবাজার ঘুরে
দেখা গেছে এক হাহাকারের চিত্র। যে মিনিকেট চালের বস্তা ঈদের আগেও সাধারণ মানুষ ৩ হাজার
১০০ টাকায় কিনতে পারতেন, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৩০০ টাকায়। মধ্যবিত্তের ভরসা
আঠাশ জাতের চালের বস্তা ২ হাজার ৭০০ টাকা থেকে এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৫০
টাকায়। এছাড়া উনত্রিশ জাতের চাল ২ হাজার ৬০০ টাকা, সুমন স্বর্ণা ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং
সুগন্ধি চিনিগুড়া চালের বস্তা ৭ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ঠেকেছে ৭ হাজার ৪০০ টাকায়।
বাজারের এই অগ্নিমূল্যের পেছনে মিল মালিক
ও ব্যবসায়ীরা একচেটিয়া মুনাফালোভী সিন্ডিকেট ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন। তাদের অভিযোগ,
মৌসুমের শেষ প্রান্তে এসে ধানের বাজার চলে গেছে বড় বড় মজুতদার ও ফড়িয়াদের নিয়ন্ত্রণে।
ফলে মিলাররা বেশি দামে ধান কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাহাদুরবাজারের চাল ব্যবসায়ী আশরাফ ক্ষোভ
প্রকাশ করে বলেন, আমাদের ব্যবসায়ী জীবনে এই সময়ে চালের এমন দাম বাড়তে দেখিনি। মিলগেট
থেকেই আমাদের চড়া দামে চাল কিনতে হচ্ছে, তার ওপর পরিবহনের খরচ তো আছেই। আমরা লাভ করছি
না, বরং পুঁজি বাঁচানোই দায় হয়ে পড়েছে।
আরেক ব্যবসায়ী ফিরোজ জানান, দাম বাড়ার
কারণে বাজারে ক্রেতা নেই বললেই চলে। আগে যেখানে দিনে ৫০ বস্তা চাল বিক্রি হতো, এখন
তা নেমে এসেছে মাত্র পাঁচ বস্তায়। মানুষ এখন পেট চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।
এদিকে দিনাজপুরের প্রায় দুই হাজার চালকলের
চাকা এখন মন্থর হয়ে পড়েছে। তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে প্রতিদিনের উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে
নেমে এসেছে। যেখানে দিনে ৭ থেকে ৮ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হতো, এখন তা ৩ থেকে
৪ হাজার মেট্রিক টনে ঠেকেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অটো, মেজর ও হাস্কিং
মিল মালিক সমিতির সহ-সভাপতি সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন এবং দিনাজপুর চাল ব্যবসায়ী
মালিক সমিতির সভাপতি আজগার আলী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, একটি অটোরাইস মিলের মোট
খরচের ১৫ শতাংশই যায় বিদ্যুতে। কিন্তু বর্তমান তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে মিলের উৎপাদন
খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে।
এর ওপর আবার নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এই অবস্থায় উৎপাদন টিকিয়ে রাখাই
অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বাজারে চাল কিনতে আসা সাধারণ ক্রেতা মনিরুল
ইসলামের কণ্ঠে ঝরে পড়লো তীব্র ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, মানুষের আয় এক পয়সাও বাড়েনি,
কিন্তু চালসহ সব জিনিসের দাম প্রতিদিন বাড়ছে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের যদি ভাত খাওয়ার
অধিকারটুকুই কেড়ে নেওয়া হয়, তবে আমরা বাঁচবো কীভাবে?
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এখনই যদি কৃত্রিম
মজুতদারী রোধ এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানির এই সংকট দূর করা না যায়, তবে আগামী দিনগুলোতে চালের
বাজার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। ভরা মৌসুমেই যদি এই আগুন জ্বলে, তবে আগামী দিনগুলোতে
সাধারণ মানুষের পাতে ভাত জুটবে কিনা সেই আশঙ্কায় কাঁপছে উত্তরপদের মানুষ।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

