বড়াইগ্রামে
'জীনের বাদশা' সিন্ডিকেটের কারণে নিঃস্ব হচ্ছে প্রবাসী পরিবার
বড়াইগ্রাম (নাটোর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ২১:০২
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার জোনাইল ইউনিয়নের চৌমহন গ্রাম। ছোট্ট এই গ্রামেই রয়েছে অন্তত ৩৭ জন কথিত ‘জীনের বাদশা’ এবং তাদের প্রায় ১৮৫ জন সহযোগী। কখনও জীনের বাদশা, কখনও তান্ত্রিক, আবার কখনও কবিরাজ পরিচয়ে ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অলৌকিক ক্ষমতার প্রচার চালিয়ে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে প্রবাসীদের টার্গেট করে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী প্রতারণার চক্র। নিঃস্ব হয়েছে কয়েকশ পরিবার।
সৌদি আরব প্রবাসী বগুড়ার বাসিন্দা দয়াল
খান। দীর্ঘদিন ধরে তার কন্যা সন্তান অসুস্থ থাকায় বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করিয়েও কাঙ্ক্ষিত
ফল পাননি। একপর্যায়ে ইউটিউবে ভিডিও দেখে পরিচয় হয় জোনাইল এলাকার কথিত জীনের বাদশা ইমরানের
সঙ্গে। মেয়েকে সুস্থ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন সময়ে তার কাছ থেকে প্রায় ১ লাখ
২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন তথাকথিত কবিরাজি চিকিৎসা চললেও শিশুটির অবস্থার উন্নতি
হয়নি, বরং আরও অবনতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
দয়াল খান জানান, ইমরানের মাধ্যমে আরও কয়েকজন
কথিত জীনের বাদশার সঙ্গে তার যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়। পরে টাকা ফেরত চাইলে তাকে বিভিন্নভাবে
হুমকি দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে তিনি সৌদি আরব থেকেই অনলাইনে বড়াইগ্রাম থানায় ৪ থেকে ৫ জনের
বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। তবে অভিযোগের পরও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে
দাবি তার।
অভিযোগ রয়েছে, প্রবাসীদের কাছ থেকে অর্থ
হাতিয়ে নিয়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন কথিত জীনের বাদশা ইমরান। জোনাইল বাজারে তার
বিলাসবহুল কফিশপ এবং একাধিক বহুতল ভবন রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে বক্তব্য
জানতে চাইলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। বরং প্রশ্ন শুনে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন মৌলভীবাজারের
বাসিন্দা বদরুল ইসলাম। তার এক নারী আত্মীয় লন্ডনে বসবাস করেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক
নানা সমস্যার সমাধানের আশায় ইউটিউবের ভিডিও দেখে চৌমহন গ্রামের কথিত জীনের বাদশা রিপন,
রক্ত সম্রাট, রাশিদুল ইসলাম ও রোকনুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। বদরুল ইসলামের
দাবি, বিভিন্ন সময়ে তার ওই আত্মীয়ের কাছ থেকে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। টাকা
পাঠানো বন্ধ করলে পরী বা জীন দিয়ে ক্ষতি করার ভয় দেখানো হয়। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি,
থানা পুলিশ এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি
বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কথিত এসব
জীনের বাদশারা এলাকায় বেশ প্রভাবশালী। এক সময় যারা নাপিতের কাজ মাঠে কৃষিকাজ কিংবা
শ্রমিকের কাজ করতেন, তারা এখন এলাকার প্রভাবশালী কোটিপতি। তাদের অনেকেরই রয়েছে ৪ থেকে
৫ তলা ভবন, একাধিক গাড়ি এবং বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদ।
স্থানীয়দের দাবি, গভীর রাত পর্যন্ত চলে
জীন-ভূত সংক্রান্ত ভিডিও ধারণ ও অনলাইন প্রচারণার কাজ। গ্রামের প্রবেশপথের বিভিন্ন
গাছে গাছে স্থাপন করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা। এতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও
ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। নগর গ্রামের জীনের বাদশা ভুয়া নাম জীবন তার নাম শামীম
সে গাজীপুর টঙ্গী মকবুল হোসেন কাছ থেকে প্রায় দুই লক্ষ ঢাকায় লতিফা নামে এক নারীর কাছ
১লক্ষ ৪০হাজার টাকা নিয়েছে। টাকা ফেরৎ চাইলে বিভিন্ন হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে জানান।
স্থানীয়দের মতে, শুধু সৌদি প্রবাসী দয়াল
খান বা যুক্তরাজ্য প্রবাসী ওই নারী নন, বছরের পর বছর ধরে শত শত প্রবাসী একই ধরনের প্রতারণার
শিকার হয়েছেন। মানুষের সরল বিশ্বাস ও দুর্বলতাকে পুঁজি করে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক
বলয় গড়ে তুলেছে কথিত এসব জীনের বাদশারা।
এ বিষয়ে নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ
শরীফুল হক বলেন, জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পুলিশ কাজ
করছে। জোনাইল ইউনিয়ন এলাকার বিষয়টি তার জানা ছিল না। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয়
আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

