মণিরামপুরে সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় জনদুর্ভোগ
মণিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ২০:৩০
খালের নাম বড় খাল। খালের দুই পারে দুই ইউনিয়ন ও দুই গ্রাম। দক্ষিণ পারে যশোরের মণিরামপুর উপজেলার কুলটিয়া ইউনিয়নের পাড়িয়ালী গ্রাম আর উত্তরে একই উপজেলার হরিদাসকাটি ইউনিয়নের পাঁচকাটিয়া গ্রাম। এই দুই গ্রামের মাঝদিয়ে বয়ে যাওয়া খালের ওপর থাকা সেতুটি দুই গ্রামকে যুক্ত করে ছিল।
সেতুটি দিয়ে এলাকার লোকজন ও যানবাহন চলাচল
করতো। কিন্তু সেতুটি একবারেই জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সেতুটি
ভেঙ্গে সেই জায়গায় নতুন একটি সেতু উদ্যোগ নেয়। খালের ওপর সেই জরাজীর্ণ সেতু ভেঙ্গে
সেই জায়গায় নতুন সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল দুই বছর আগে। কাজের মেয়াদও শেষ হয়েছে
এক বছরেরও বেশি সময় আগে। কিন্তু সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ
না হওয়ায় সড়কটি দিয়ে চলাচলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন অন্তত ২০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ।
স্থানীয়সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি)
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার প্রকৌশলীর কার্যালয়সূত্রে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ও বন্যায়ক্ষতিগ্রস্থ
পল্লী সড়ক অবকাঠামো পূর্নবাসন প্রকল্পের (সিএএফডিআরআইআরপি) আওতায় নেহালপুর ইউপি-হাজিরহাট
বাজার ভায়া কুলটিয়া ইউপি সড়কের 'বড় খালের' ওপর ২০ মিটার দীর্ঘ একটি আরসিসি গার্ডার
সেতু পুন:নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২ কোটি ৭২ লাখ ৭৪ হাজার ৯৯২ টাকা ৮১৬ পয়সা
ব্যয়ে সেতু পুন:নির্মাণের কাজ পায় সাতক্ষীরার পলাশপোলের ঠিকাদার ইকবাল জমাদার। ২০২৪
সালের ১ মে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার
কথা ছিল। কিন্তু এখনও পর্যন্ত অর্ধেক কাজ হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার হরিদাসকাটি
ইউনিয়নের হাজিরহাট থেকে একটি সড়ক সোজা দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। সড়কটি ধরে প্রায় সাড়ে
তিন কিলোমিটার গেলে একটি বিল। বিলের বুক চিরে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে চলে গেছে বড় খাল।
খালটির বেশিরভাগ অংশ বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। খালের দুই পাশে দুটি বড় কংক্রিটের পিলার
তোলা হয়েছে। দুই পিলারের মাঝে পুরনো সেতু রয়েছে। সেতুটির বেশিরভাগ অংশ ভাঙ্গা হয়েছে।
নিচের অংশ রয়ে গেছে। দুই পিলার নিচের দিকে মাটিতে পড়ে আছে কয়েকটি লোহার শার্টার।
যাতায়াতের জন্য নির্মাণাধীন সেতুটির পূর্ব
পাশে খালের ভেতর কাঠের গুঁড়ি পুঁতে তার ওপর তক্তা বিছিয়ে দিয়ে অস্থায়ী সেতু তৈরি করা
হয়েছে। অস্থায়ী সেতুটি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। লোকজন পায়ে হেঁটে নড়বড়ে সেতু পার হচ্ছেন। অনেক
কষ্ট করে ভ্যান, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল নড়বড়ে সেতুর ওপর দিয়ে টেনে ও ঠেলে পার করছেন
অনেকে। কেউ কেউ আবার নড়বড়ে সেতু পার হতে না পেরে পিলার সামনে সড়কে ভ্যান ও মোটরসাইকেল
রেখে বসে আছেন।
এ সময় কথা হয় কয়েকজন এলাকাবাসীর সঙ্গে।
তারা জানান, নেহালপুর ইউপি-হাজিরহাট বাজার ভায়া কুলটিয়া ইউপি সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে এলাকার অন্তত ২০টি গ্রামের চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ চলাচল করেন।
কিন্তু দীর্ঘদিন সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় তারা এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন চরম ভোগান্তিতে
চলাচল করেন। ভবদহ জলাবদ্ধতার কারণে বর্ষা মৌসুমে অস্থায়ী কাঠের সেতুটি পানিতে ডুবে
থাকে। এই সময় সড়কটি দিয়ে যাতায়াত একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
তারা জানান, ঠিকাদার কয়েকদিন ধরে কাজ করেন।
এরপর চলে যান। আবার কয়েকদিন পর এসে কাজ শুরু করেন। এভাবে কাজ করায়দুই বছর ধরে কাজের
অর্ধেকও হয়নি। পদ্মনাথপুর গ্রামের ভ্যানচালক আব্দুল আজিজ মোড়ল (৭০) বলেন, দুই বছর ধরে
ঠিকাদার একটু একটু করে কাজ করছেন। কাজ শেষই হচ্ছে না। কাঠের নড়বড়ে সেতু দিয়ে ভ্যান
পার করা খুবই কষ্টকর। এজন্য যাত্রীও ঠিকমতো হচ্ছে না। খুব কষ্টে আছি।
ডাঙ্গা মহিষদিয়া গ্রামের ঘাটশ্রমিক রোস্তম
সরদার (৫০) বলেন, সেতুর কারণে সড়কটি দিয়ে যাতায়াত করতে খুবই সমস্যা হচ্ছে। শুকনোর সময়
ভাঙ্গাচোরা কাঠের সেতু দিয়ে কষ্ট করে পার হতে পারলেও বর্ষার সময় একদম চলাচল করা যায়না।
খুব দুর্ভোগে আছি।
পাঁচবাড়িয়া গ্রামের ভ্যানচালক ভুপতি রায়
(৬৫) বলেন, খালের ওপারে ভ্যান থেকে যাত্রী নামিয়ে দিয়ে কাঠের সেতুর ওপর দিয়ে টেনে ভ্যান
পার করে এপারে এসেছি। নড়বড়ে সেতুর ওপর দিয়ে ভ্যান টানতে খুব কষ্ট হয়েছে। সেতুটি না
হওয়া পর্যন্ত এই কষ্ট যাবে না। আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই।
হরিদাসকাটি গ্রামের কৃষক দেবদাস রায় (৪৬)
বলেন, এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করা সহজ। দূরত্বও কম ও সময়ও কম লাগে। কিন্তু সেতুর কাজ
শেষ না হওয়ায় দুই বছর খুব কষ্ট করে এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। কবে যে এই দুর্ভোগের
শেষ হবে!
মণিরামপুর উপজেলা প্রকৌশলী ফয়সাল আহমেদ
বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে এলাকা দীর্ঘদিন পানিতে ভরে থাকে। এজন্য ছয়মাস কোনো কাজ করা
যায়না। বর্তমানে সেতুটির ঢালাইয়ের জন্য শার্টার বসানোর কাজ চলছে। তা ছাড়া নিচে পুরাতন
সেতুর কিছুটা অংশ রয়ে গেছে। ওই অংশটি ভেঙ্গে সরিয়ে নেওয়ারও কাজ চলছে। এটা শেষ হলে স্লাবের
কাজ শুরু হবে। বর্তমানে সেতুটির ৫০ শতাংশ কাজ হয়েছে। স্লাবের কাজ শেষ হলে ৮০ শতাংশ
কাজ হয়ে যাবে।
আশা করছি, চলতি বছরের মধ্যে সেতুটির নির্মাণকাজ
শেষ করা যাবে। মানুষ ও ছোট যান চলাচলের জন্য খালের ওপর নির্মিত অস্থায়ী কাঠের সেতুটি
নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। এতে চলাচলে দুর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে। ঠিকাদারকে দ্রুত এই অস্থায়ী
কাঠের সেতুটি ঠিক করে দিতে বলা হয়েছে।
ঠিকাদার ইকবাল জমাদার বলেন, জলাবদ্ধতার
কারণে পানি সেচে সেতুর কাজ শুরু করতে হয়েছে। এজন্য সময় বেশি লাগছে। পুরাতন সেতু ভাঙ্গার
কাজ আর দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। এরপর আমি সেতুর স্লাবের কাজ শুরু করবো।
আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত আমার সময় আছে। আশা করছি, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সেতুর
কাজ শেষ হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, লোকজনের চলাচলের জন্য পাশের
নড়বড়ে কাঠের সেতুটি দুইদিনের মধ্যে মেরামত করে দেওয়া হবে।

