বৈরী আবহাওয়ায় সুন্দরবনে আশ্রয়ে শত শত ফিশিং ট্রলার
মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ২০:১৫
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন উপকূলসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া বৈরী আবহাওয়া, প্রবল পূবালী বাতাস ও বিশাল ঢেউয়ের মুখে টিকতে না পেরে শত শত ফিশিং ট্রলার ও মাছ ধরার নৌকা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-খাল এবং উপকূলীয় মৎস্যঘাটে ভিড় করেছে। দীর্ঘ ৫৮ দিনের সরকারি মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশসহ অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ আহরণের আশায় সাগরে যাওয়া জেলেরা যাত্রার শুরুতেই প্রকৃতির নির্মম রূপের মুখোমুখি হয়ে চরম হতাশা নিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন।
নতুন স্বপ্ন নিয়ে বঙ্গোপসাগরে পাড়ি দিয়েছিলেন হাজারো জেলে। দাদন, ঋণ আর ধার করা টাকায় জ্বালানি, বরফ, খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনে ট্রলার সাজিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন তারা। কিন্তু সাগরে পৌঁছানোর পরই প্রকৃতি যেন সেই স্বপ্নকে মুহূর্তেই ভেঙে দিল। হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া বৈরী আবহাওয়া, প্রবল পূবালী বাতাস ও ভয়ংকর ঢেউয়ের মুখে টিকতে না পেরে শত শত ফিশিং ট্রলার এখন সুন্দরবনের নদী-খাল ও উপকূলীয় নিরাপদ আশ্রয়ে নোঙর করে আছে। মাছ ধরা বন্ধ, আয় বন্ধ—অথচ প্রতিদিন বাড়ছে জ্বালানি, বরফ ও শ্রমিকের ব্যয়। ফলে নতুন করে গভীর আর্থিক সংকটে পড়েছেন হাজারো জেলে ও ট্রলার মালিক।
শুক্রবার সুন্দরবন উপকূল, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা, রায়েন্দা, পাথরঘাটা, বরগুনাসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা ঘুরে এবং জেলে, ট্রলার মালিক, আড়তদার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রথম কয়েকটি দিনই সামুদ্রিক মাছ আহরণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় সাগরে অবস্থান করতে না পারলে মৌসুমের বড় একটি সম্ভাব্য আয় হাতছাড়া হয়ে যায়। অথচ ঠিক সেই সময়েই বৈরী আবহাওয়া পুরো উপকূলজুড়ে মৎস্য অর্থনীতিকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই দিন ধরে বঙ্গোপসাগর অত্যন্ত উত্তাল রয়েছে। প্রবল বাতাসে সাগরে কয়েক মিটার উচ্চতার ঢেউ সৃষ্টি হয়েছে। গভীর সাগরে অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় শত শত ফিশিং ট্রলার সুন্দরবনের দুবলার চরসংলগ্ন ভেদাখালী খাল, মেহেরআলী, আলোরকোলসহ বনের বিভিন্ন নিরাপদ খালে আশ্রয় নিয়েছে। একই সঙ্গে অসংখ্য ট্রলার শরণখোলার রায়েন্দা, পাথরঘাটা, মহিপুর, কুয়াকাটা, নিদ্রাসখিনা ও আশপাশের উপকূলীয় ঘাটে নোঙর করে রয়েছে।
সুন্দরবনের ভেদাখালী খালে আশ্রয় নেওয়া বাগেরহাটের বগা এলাকার ফিশিং ট্রলারের মাঝি নজরুল ইসলাম মোবাইল ফোনে বলেন, “দুই দিন ধরে সাগরে এমন ঢেউ ছিল যে ট্রলার ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরা সম্ভব হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে সুন্দরবনের খালে আশ্রয় নিয়েছি। এখন আবহাওয়া ভালো না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই।”
শরণখোলা উপজেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, “নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা দাদন করে সাগরে গেছেন। কিন্তু শুরুতেই দুর্যোগে পড়ে ফিরে আসতে হয়েছে। কয়েকশ ট্রলার এখন নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু কোনো আয় নেই।”
রায়েন্দা মৎস্যঘাটের আড়তদার কবির হোসেন জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক ট্রলার সাগরে যেতেই পারেনি। গত দুই দিন ধরে ঘাটেই সারিবদ্ধভাবে নোঙর করে রয়েছে। এতে পুরো ঘাট এলাকায় ট্রলারের জটলা তৈরি হয়েছে।
বরগুনা জেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, “উত্তাল সাগরে অবস্থান করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ ট্রলার উপকূলে ফিরে এসেছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হলে আবার সাগরে যাওয়ার সুযোগ নেই।”
ঋণের চাপে জেলেদের দুশ্চিন্তা উপকূলীয় এলাকার ট্রলার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি মাঝারি আকারের ট্রলার গভীর সাগরে মাছ ধরার জন্য প্রস্তুত করতে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। এর বড় অংশই আসে এনজিও, মহাজন কিংবা আড়তদারদের দাদন থেকে। মাছ ধরা বন্ধ থাকলে সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে প্রতিটি বৈরী আবহাওয়া জেলেদের জন্য শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটও ডেকে আনে। সুন্দরবনই এখন নিরাপদ আশ্রয় উপকূলীয় নৌযান চালকদের মতে, বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়া দেখা দিলে সুন্দরবনের নদী-খালই শত শত ট্রলারের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বনাঞ্চলের ভেতরের খালগুলো ঢেউয়ের তীব্রতা কমিয়ে দেয়, ফলে ট্রলার ও জেলেদের জীবন রক্ষা সম্ভব হয়। তবে দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করলে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, জ্বালানি ও বরফের সংকট দেখা দেয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
উপকূলজুড়ে এখন একটাই প্রত্যাশা—আবহাওয়া দ্রুত স্বাভাবিক হোক। কারণ, প্রতিটি বিলম্বিত দিন মানেই হাজারো জেলে পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, বাড়তে থাকা ঋণের বোঝা এবং দেশের সামুদ্রিক মৎস্য অর্থনীতিতে নতুন ক্ষতির হিসাব।
বিকে/মান্নান

