ময়মনসিংহে ধর্ষণচেষ্টার মিথ্যা অপবাদে মুহতামিমকে ফাঁসানোর অভিযোগ
ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে কে?
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ২০:৪৫
ছবি: সংগৃহীত
ময়মনসিংহ শম্ভুগঞ্জের স্বনামধন্য উম্মুল কুরা মহিলা মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা সাইফুল ইসলামকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধর্ষণচেষ্টার মিথ্যা অপবাদ দিয়ে ফাঁসানো ও সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মামলা করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে ওই মুহতামিমকে।
আরও অভিযোগ উঠেছে, মুহতামিমকে ফাঁসানোর ব্যাপারে মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মাওলানা মুস্তফা হোসাইনের হাত রয়েছে। পাশাপাশি সাবেক যুবলীগ কর্মী বিল্লাল হোসেন মানিক এ বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক অপপ্রচার চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ মিলেছে।
এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিক, মাদ্রাসার অভিভাবক মহল, স্থানীয় উলামায়ে কেরাম ও ইত্তেফাকুল উলামা মোমেনশাহীর নেতারা এ ঘটনাকে ষড়যন্ত্রমূলক দাবি করে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি ঘটনার মূলহোতা, ষড়যন্ত্রকারী ও প্রকৃত অপরাধীর শাস্তির দাবি জানান তারা।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, গত ২ জুলাই সাইফুল ইসলাম শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার সোহানাকে (১১) অফিস কক্ষে ডেকে দরজা বন্ধ করে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। তখন ওই শিক্ষার্থীর চিৎকার শুনে পাশের ঘরের অন্য শিক্ষার্থীরা জানালা দিয়ে দেখে ফেলে। তখন শিক্ষার্থীদের চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে আশপাশের স্থানীয় লোকজন এসে বিবাদীকে আটক করে।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্রী সোহানার বাড়ি গিয়ে ঘটনা জানায়। তাৎক্ষণিক সোহানার বাবা সোহেল মিয়া, চাচা সুমন (৩৭), সাইফুল (৩৮) এবং মোকসেদুলদের (৪০) সঙ্গে নিয়ে মাদ্রাসায় আসেন।
তবে মামলার এজাহার ও মামলার বাদী সোহেল মিয়ার বক্তব্যে বেশ অসংগতি মিলেছে। তিনি বলেন, আমার মেয়েকে ধর্ষণ চেষ্টার খবর পেয়ে আমরা ৩টার দিকে মাদ্রাসা যাই। এরপর এলাকার মানুষ জড়ো হয়। তারপর থানায় ফোন করে পুলিশে সোপর্দ করি।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণ এবং মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষিকা ও স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী জানা যায় আরও ব্যতিক্রম তথ্য।
মাদ্রাসার শিক্ষাসচিব মাওলানা মাসুদুল হক শিবলী বলেন, অন্যদিনের মতোই ওইদিন স্বাভাবিকভাবে ক্লাস হয়। দুপুর ১২টা ৪০-এ ক্লাস শেষ হওয়ার পর আমি প্রায় ২টা ১৫ পর্যন্ত মাদ্রাসায় ছিলাম। দুপুর ১২টা বা সাড়ে ১২ টার দিকে অভিযুক্ত কোনো ঘটনার প্রশ্নই আসে না।
তিনি আরও বলেন, দিন-দুপুরে সব শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থী মাদ্রাসার ভিতরে উপস্থিত থাকা অবস্থায় এমন একটা ঘটনা ঘটে যাবে, আর কেউ টের পাবে না; এটা অসম্ভব। নিঃসন্দেহে মুহতামিমের বিরুদ্ধে এটা একটা গভীর ষড়যন্ত্র।
তিনি বলেন, মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে সাড়ে ১২টার দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী সোহান বাবাকে সংবাদ দেন। এটাও সত্য নয়। কারণ, মাদ্রাসার ক্লাস চলাকালীন কেউ বাইরে বের হতে পারে না। ওইদিনও কেউ বের হয়নি।
এছাড়া মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষিকা ও বিভিন্ন শিক্ষার্থী জানান, ওইদিন সোহানা উল্লেখিত সময়ে যথারীতি ক্লাসেই অবস্থান করে। ক্লাসের পর সে স্বাভাবিকভাবে হাসিখুশিতেই বাড়ি ফিরে। উক্ত সময়ে পাঠদানে নিযুক্ত শিক্ষিকাও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, দুপুরে মাদ্রাসা ছুটি হওয়ার আরও পরে বিকেল চারটা-পাঁচটার দিকে মুহতামিমের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উল্লেখ করে সোহেল মিয়া এবং আরও কয়েকজন মিলে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মাদ্রাসায় আক্রমণ করেন। এ সময় অফিসে অবস্থানরত মুহতামিমকে মারধর ও হেনস্তা করে মৌখিক স্বীকারোক্তি নেওয়ার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি মাদ্রাসার সাইনবোর্ডসহ ভবনের বেশকিছু অংশ ভাঙচুর করে।
পরবর্তীতে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানায় ফোন করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে দেওয়া হয় মুহতামিমকে। ওইদিন সারা রাত এবং পরদিন সারা দিন থানায় রেখে নানা নাটকীয়তার পর সন্ধ্যায় মামলা করে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. শরিফুল ইসলাম ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানান, ঘটনার আপস করতে বাদীর পক্ষ থেকে প্রথমে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকার মাধ্যমে সমঝোতার ব্যাপারটি উল্লেখ করেন মাওলানা মুস্তফা হোসাইন।
এরপর বলা হয়, ৫০ হাজার হবে না। পাঁচ লাখ টাকা লাগবে। এতে অনেক মিডিয়াও সম্পৃক্ত আছে। মিডিয়ার পক্ষে সাবেক যুবলীগ কর্মী সাংবাদিক বিল্লাল হোসেন মানিকের টাকা দাবিরও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে বিল্লাল হোসেন মানিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার নিজের ফেসবুক আইডিতে মুহতামিমের ছবিতে ‘ধর্ষক’ লিখে ব্যাপক অপপ্রচার চালান।
মুহতামিম মাওলানা সাইফুল ইসলামের বাবা অভিযোগ করে বলেন, আমার ছেলে সম্পূর্ণ নির্দোষ। সহকারী শিক্ষক মাওলানা মুস্তফা হোসাইন মাদ্রাসা দখল করার লক্ষ্যে চক্রান্ত করে ফাঁসিয়েছে আমার ছেলেকে।
তিনি আরও বলেন, আমার ছেলে গ্রেপ্তারের পর থেকে মাওলানা মুস্তফা নিজে ও বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলছে, পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে সমাঝোতা করলে আমার ছেলেকে মুক্ত করে দিবে।
জানা যায়, মাওলানা মুস্তফার বাড়ির পাশেই শিক্ষার্থী সোহানার বাড়ি। তিনি বেশ কিছুদিন ধরেই মুহতামিমকে ফাঁসানোর জন্য সোহানার পরিবারকে ফুসলিয়ে যাচ্ছিলেন।
ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। মুহতামিমের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদের ষড়যন্ত্রের মূল সূত্রপাত শুরু হয় আরও দেড় বছর আগে থেকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষিকা জানান, ২৫ সালের শুরুতে এক শিক্ষিকার মাধ্যমে মুহতামিমের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ সাজানোর চেষ্টা করেছিলেন মাওলানা মুস্তফা হোসাইন। ওই শিক্ষিকা নিজেও ষড়যন্ত্রের ব্যাপারটি নিশ্চিত করেছেন।
ওই সময় মাওলানা মুস্তফা বিভিন্ন শিক্ষার্থী ও শিক্ষিকাকে ফুসলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন মিথ্যা অপবাদে মুহতামিমকে অভিযুক্ত করতে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা ওই ষড়যন্ত্রের বিষয়টি মুহতামিম ও শিক্ষিকাকে অবগত করে দেয়। ফলে তখন সফল হতে পারেননি মাওলানা মুস্তফা। পরবর্তীতে গত বৃহস্পতিবার এই ঘটনা সাজানো হয়।
মাওলানা মুস্তফা হোসাইনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। জানা যায়, তাকে ময়মনসিংহ দেখা যাচ্ছে না।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার তদন্তকারী অফিসার মো. ফারুক আহমেদ মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বাদীপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করে বিবাদীকে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি বর্তমান তদন্তাধীন আছে।
ইত্তেফাকুল উলামা ও স্থানীয় উলামায়ে কেরামের ক্ষোভ
মাওলানা সাইফুল ইসলামকে ফাঁসানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত রোববার বাদ ইশা শম্ভুগঞ্জ নুরুল হেরা মাদ্রাসায় ইত্তেফাকুল উলামার নেতারাসহ স্থানীয় উলামায়ে কেরামের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে শতাধিক আলেম উপস্থিত ছিলেন। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়। বৈঠকে মাওলানা মুস্তফার প্রসঙ্গেও আলোচনা হয়। উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি মাওলানা মুস্তফার দিকেই সন্দেহের তীর ছোড়েন।
বৈঠক শেষে ইত্তেফাকের জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি শরীফুর রহমান বলেন, ইত্তেফাকসহ সব উলামায়ে কেরামের বক্তব্য হলো- এটা একটা ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনা। আমরা এর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাই। পাশাপাশি দাবি জানাই, প্রকৃত অপরাধী বের করে তার শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
তিনি আরও বলেন, এর আগে ঘটনার দিন রাতেই ইত্তেফাকের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুফতি মুহিব্বুল্লাহর নেতৃত্বে একটি টিম ওসির সঙ্গে দীর্ঘ ৪৯ মিনিট পর্যন্ত বৈঠক করে। ঘটনাকে ষড়যন্ত্রমূলক উল্লেখ করে মাওলানা সাইফুল ইসলামকে ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। তখন ওসি আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, বাদীপক্ষ মামলা করতে রাজি নয়। তাই মীমাংসার মাধ্যমে মাওলানাকে ছেড়ে দিব।
মুহতামিমের ব্যাপারে ছাত্রী-শিক্ষিকা ও অভিভাবকদের মন্তব্য ও দাবি
মাদ্রাসার ছাত্রী-শিক্ষিকা ও মহিলা অভিভাবকদের মন্তব্য হলো, মাদ্রাসার মুহতামিম সাহেবকে আমরা কখনোই কোনো দিন সামান্যতম চারিত্রিক ত্রুটি দেখিনি। আমরা দীর্ঘ সময় ধরে মুহতামিমের সঙ্গে কথাবার্তা বলি, কখনো কোনো ব্যাপারে সন্দেহও হয়নি।
তারা আরও বলেন, চারিত্রিক কলঙ্ক, অর্থ আত্মসাৎ ও মাদ্রাসা দখলের উদ্দেশ্যে এই ষড়যন্ত্র করা হয়। নিঃসন্দেহে আমাদের মুহতামিম নির্দোষ। তাকে গভীর ষড়যন্ত্রে ফাঁসানো হয়েছে উল্লেখ করে স্বসম্মানে মুক্তির দাবি জানান তারা।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

