নীলফামারীর সৈয়দপুরে বাঁশের তৈরী পণ্যে লাভবান হয়েছে “আরিফুল হস্ত শিল্পের” উদ্যোক্তা মো. হাজীমুল ইসলাম। বাঁশের তৈরি পরিবেশবান্ধব পণ্য এখন শুধু ঘরের শোভাবর্ধক নয়, বরং তা ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মতো বিভিন্ন দেশে জায়গা করে নিয়েছে। কুটির শিল্পের এই নীরব বিপ্লব বদলে দিয়েছে ওই উদ্যোক্তার জীবনমান।
উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের উত্তর সোনখুলি ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের উদ্যোক্তা হাজীমুল বাঁশ দিয়ে হরেক রকমের পণ্য তৈরী করে থাকেন। তিনি ছিলেন, একজন বাঁশের সাধারণ ছুতার (কামলা)। তৈরী করতেন বাঁশের ছোট খাট সৌখিন আসবাবপত্র, খেলনা ও চৌচালা টিনসেট ঘরের সেলিং বা ছাদ।
তিনি ২০১৮ সালে বানিজ্যিকভাবে শুরু করেন, বাঁশের ঝুঁড়ি, চায়ের ট্রে,
টেবিল ল্যাম্প স্ট্যান্ড, সাবান কেস, ঘড়ি, সোফা সেট, বাঁশের জগ, মগ, টিস্যু বক্স, একতারা, আয়নার স্ট্যান্ড, ফুলদানিসহ হরেক রকমের বাঁশের তৈরি পণ্য। ধীরে ধীরে এসব পণ্য দেশ এবং বিদেশে সমাদৃত হচ্ছে।
ওই সব পণ্য ছাড়াও, ঘর সাজানোর নানা উপকরণ ও ফার্নিচারসহ ১২০ প্রকারের পণ্য। ন্থানীয় বেকার নারী ও পুরুষদের নিয়ে প্রায় ২০ জন শ্রমিকের হাতের ছোঁয়ায় প্রতিটি পণ্য হয়ে ওঠেছে অতি আর্কশনীয় ও চমৎকার। তাদের শ্রম, নিপুন হাতের ছোঁয়া ও দক্ষতায় তৈরি এসব পণ্য আজ শুধু দেশেই নয়, দেশের বাইরেও জায়গা করে নিয়েছে। হাজীমুলের পাশাপাশি ঘুরে দাঁড়িয়েছে তাঁর কারখানার শ্রমিক কর্মচারীরাও।
ওই কারখানার হাজীমুলের ছেলে তরিকুল ইসলাম জানান, “শুরুতেই আমি একাই বাবার সাথে কাজ করতাম। এখন এখানে ২০ জন লোক কাজ করেন। এরমধ্যে নারী ১০ জন ও পুরুষ ১০জন। সবাই মোটামুটি এখানে কাজ করে পরিবার নিয়ে ভালই আছে। তাদের অন্যখানে নতুন কোন কাজের খোঁজে যেতে হয় না। প্রতিদিন সকালে সবাই কারখানায় চলে আসে। দিন শেষে কাজের ওপর ভিত্তি করে ৫০০-৬০০ টাকা মজুরী দেওয়া হয়। তাই দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে তারা ভালই চলছে।”
একই খারখানার শ্রমিক মিনতি, দুলালি, পরিতোশ রায় ও ফেরদৌস আহমেদ জানান, “প্রথমদিকে বেচা কেনা কম হলেও এখন ঢাকাসহ দেশ বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।
ঢাকা থেকে অনেকেই অনলাইনে অর্ডার দিয়ে থাকেন। জানতে চাইলে তারা বলেন, প্রকারভেদে একটি ফুলদানি ৩৫০-৪৫০ টাকা, জগ ১টা ৪৫০ টাকা, কাপ ৮০ টাকা, মগ ১৫০ টাকা ও ট্রে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হ”েছ। এখানে প্রতিদিন সাংবাদিকসহ সাধারণ দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে।”
দুলালি বেগম জানান, “স্বামীর অভাবের সংসারে একজনের আয় দিয়ে পরিবার ভালভাবে চলে না। তাই বাড়ীর পাশেই এমন কাজ পেয়ে ভাল হয়েছে। স্বামীর আয় ও আমার টাকা দিয়ে দু,বেলা দু,মুটো ভাত খেতে পারছি। জানতে চাইলে বলেন, আমি প্রতিদিন ৪৫০ টাকা হাজিরা পাই। দুইজনের আয় দিয়ে ছেলে মেয়ের লেখাপড়ার খরচের পাশাপাশি কিছু জমাও হচ্ছে।”
ওই উদ্যোক্তা আরও জানান, প্রথমদিকে অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজকে সাফল্যের মুখ দেখছেন। তবে বাজারজাত করার অনিশ্চয়তা, কাঁচামালের সংকট আর সীমিত জনবল দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হয়েছে হাজিমুলকে। তবুও থেমে থাকেনি তার অদম্য ইচ্ছা। ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার প্রচারনা ও অনলাইন মার্কেটিংসহ মানুষের ভালবাসা ও আস্থা এবং মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে
পৌঁছে যান বিশ্ব বাজারে। হাজীমুলের চোখে মুখে এখন আরও বড় হওয়ার স্বপ্ন। তিনি চান সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পেলে এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বড় ধরণের শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে পারবে।
তাছাড়া, আধুনিক যন্ত্রপাতি, নতুন ডিজাইনের পণ্য তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভাল অবস্থান গড়ে তুলতে এসবের অনেক প্রয়োজন। একই সঙ্গে এলাকার তরুনদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার স্বপ্নও তিনি দেখেন।
বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ায় বাঁশের তৈরি পণ্য সামগ্রী আজ এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। সল্প সময় ও কম খরচে প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে এবং নান্দনিক নকশার কারণে এসব পণ্য বিদেশিদের কাছে দিন দিন আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
ওই উদ্যোক্ততা এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, পাঁচ সদস্যের পরিবারে এক সময় তাঁর ভিটে ছাড়া কিছুই ছিল না। উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী বায়ারের মাধ্যমে বিদেশে পাঠিয়ে প্রতি মাসে খরচ বাদে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় করছেন। এখন তিনি লাভের মুখ দেখছেন।
জানতে চাইলে হাজীমুল বলেন, উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে হাইব্রিট জাতের বাঁশ ও দিনাজপুর থেকে চিকন বাঁশ সংগ্রহ করে আনতে প্রতিটি বাঁশের পরিবহন খরচ পড়ে ৬০০-৬৫০ টাকার মতো। উপকরণের দাম ও শ্রমিকের মজুরী বাড়ায় লাভ একটু কম হয়।
তিনি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কুটির শিল্পে (বিসিক) প্রশিক্ষন নিয়ে দক্ষতার সাথে কাজ করছেন। বাঁশের তৈরী পণ্যের উপার্জিত আয় থেকে তিন ছেলের পড়াশোনার খরচসহ ও আমাদের দিন ভালই চলছে। এই পেশায় আমি এখন মোটামুটি লাভবান হয়েছি এবং ভাল আছি।
এ ব্যাপারে জেলা কার্যালয়ের উপ-ব্যব¯’াপক মো. নূরেল হক বলেন, “হাজীমুলের কুটির শিল্প শুধু উৎপাদন কেন্দ্রই নয়, ঢাকাসহ এটি বিশ্ব বাজারে জায়গা করে নিয়েছে। তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা। বাঁশের তৈরী পণ্যে নিহিত রয়েছে তার জীবনের গল্প, আর বিশ্ব বাজারে পরিচিত করেছে বাংলাদেশকেও। আমার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিনাসুদে এক লাখ টাকা ঋণ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও নিয়মিত খোঁজ খবরসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে।”
বিকে/মান্নান

