নোয়াখালীতে বিপন্ন মানুষের পাশে সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা
এম সালাহ উদ্দিন, নোয়াখালী
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ২১:২২
নোয়াখালীর প্রতিষ্ঠিত উন্নয়ন সংস্থা সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে চরাঞ্চলসহ প্রান্তিক ও দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে আসছে। দারিদ্র্য, নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় থেকেই সংস্থাটির যাত্রা শুরু করে।
সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট সমাজসেবক ও মানবদরদী মরহুম ফজলুল হক (হক সাহেব) ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর মৃতদের দাফন ও সৎকার এবং ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে সক্রিয়ভাবে মানুষের দুর্দশার সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা। প্রাথমিক পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বয়স্ক শিক্ষা ও ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে কাজ শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সংস্থার কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুর ও চট্টগ্রামে অতিদরিদ্র, দরিদ্র, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করছে। মাইক্রোফাইন্যান্সের পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, উৎপাদন ও আয়বর্ধক উদ্যোগ, ভিক্ষুক পুনর্বাসন, সমৃদ্ধি ও প্রবীণ কর্মসূচি, কিশোর উন্নয়ন, শিক্ষাবৃত্তি, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখছে সংস্থাটি। ১৯৯৩ সালে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর সহযোগী সংস্থা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি শুরু করে। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন প্রয়োজনভিত্তিক ঋণখাত যুক্ত হয়ে বর্তমানে ২৬টি খাতে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ৬টি জেলায় ৮৫টি শাখার মাধ্যমে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এসব আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সংস্থার আর্থিক কার্যক্রম এখন শুধু ক্ষুদ্রঋণে সীমাবদ্ধ নয়। সঞ্চয়, কৃষি ও জীবিকাভিত্তিক অর্থায়ন, আবাসন ঋণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তার মাধ্যমে গ্রাহকদের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কৃষক, মৎস্যজীবী, নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে। এই ধারাবাহিকতায় সাগরিকা ওহপষঁংরাব ঋরহধহপব বা অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—যার লক্ষ্য হলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনভিত্তিক, সহজলভ্য ও দায়িত্বশীল আর্থিক সেবা নিশ্চিত করা।
কর্মসূচির আওতায় কৃষি উদ্যোগগুলোকে ফসল উৎপাদন ও বহুমুখীকরণ, জলবায়ু-স্মার্ট ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, কৃষি উপকরণ ও বীজ ব্যবস্থাপনা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজার উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা ও নিরাপদ কৃষি ক্লাস্টার এইসব প্রধান ক্ষেত্রে পরিচালিত করা হয়। মৎস্য খাতে কার্যক্রমগুলো মূলত পাঁচটি ধারায় পরিচালিত হয়—মানসম্মত পোনা উৎপাদন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি, জলবায়ু-স্মার্ট ও বহুমুখী মাছ-চিংড়ি-কাঁকড়া চাষ, দেশীয় ও পুষ্টিসমৃদ্ধ মাছ সংরক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও খামার যান্ত্রিকীকরণ এবং মৎস্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ।
প্রাণিসম্পদ খাতে মূল কার্যক্রমগুলো হলো গবাদিপশু ও পোল্ট্রি উৎপাদন, দুধ-মাংস-ডিম উৎপাদন বৃদ্ধি, আধুনিক প্রজনন ও খামার প্রযুক্তি, পশুখাদ্য ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও বাজার সংযোগ—এর মাধ্যমে উন্নত জাত, প্রযুক্তিনির্ভর খামার ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন এবং খামারভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিন খাতে সমন্বিতভাবে এ পর্যন্ত ২,৮৫০টি ভিন্নভিন্ন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে কোভিড-১৯ এ ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পূনরূদারে অর্থায়ন ও তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি,পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উদ্যোগের সম্প্রসারণে অর্থায়ন ও নিন্ম আয়ের পরিবারভুক্ত তরুণদের (শিক্ষানবিশ) পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং কর্মসংস্থান সহায়তা প্রদান করা হয়। নোয়াখালী, লক্ষীপুর ও ফেনী জেলার ১০টি উপজেলায় মোট ১৮টি শাখার রেইজ প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সংস্থার ঋণ কার্যক্রমভুক্ত ১৮২৭ ঋণী সদস্য ও কর্মএলাকার পিছিয়ে পড়া ক্ষতিগ্রস্থ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নোয়াখালী জেলার ৫টি উপজেলার ১২টি শাখার মাধ্যমে ৮২০জন উপকারভোগীর মাঝে উন্নত প্রযুক্তি যেমন এরোটর মেশিন, সোলার লাইট, ফিডিং রিং, অটোফিডার, ফিডিং টি, সোলার প্যানেল, জিওলাইট, ইস্ট, মোলাসেস, উপকরণ (ড্রাম), মিনি ফিড মিল মেশিন ইত্যাদিও মাধ্যমে প্রকল্পের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সাগরিকা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরির জন্য কাজ করছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে এযাবত নোয়াখালী জেলার তিনটি উপজেলার ২৪০ জন ম্যাচমেকার, ২০০০ জন কার্ডধারী মহিলা, ২৩২০ জন কার্ডধারী মহিলাদের স্বামী অথবা পরিবার প্রধান, ১১০ জন গ্রাম পুলিশ, ৩২জন গণমাধ্যম কর্মী (নোয়াখালী জেলার ০৯ উপজেলার প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া) এর সাথে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক সভা করা হয়েছে।
শিক্ষাবৃত্তি কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য সংস্থার কর্মএলাকায় দরিদ্র ও অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি যেমন- পিকেএসএফ শিক্ষাবৃত্তি, এমআরএ-এমএফআই বৃত্তি ও সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে ফজলুল হক ফাউন্ডেশন শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হয়। সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত শিক্ষাবৃত্তির আওতায় এ পযন্ত ১৫২জন শিক্ষার্থীর মাঝে ৫১২০০০ টাকা প্রদান করা হয় । ১৯৯৩ সাল থেকে সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা কতৃক পরিচালিত সাগরিকা ডায়ানস্টিক সেন্টার একটি স্বাস্থ্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান চালু করে এবং নোয়াখালী জেলার সূবর্ণচর উপজেলার ০৮টি ইউনিয়নের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে স্বল্পমূল্যে সঠিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা ও কর্ম এলাকার সাধারণ জনগষ্ঠির রোগ নির্ণয় এবং স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নয়ন, জন্মহার কমানো, মাতৃ মৃত্যুরোধ, শিশু মৃত্যুহার কমানো, প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ প্রতিরোধ কার্যক্রম শুরু করে।
বিনামূল্যে চক্ষু ছানি অপারেশন ও ওষুধ বিতরণ কার্যক্রম: বাংলাদেশ ডিজাস্টার প্রিপেয়ার্ডনেস সেন্টার (বিডিপিসি)-এর সহযোগিতায় মোহাম্মদপুর, চরক্লার্ক, পূর্ব চরবাটা, চরওয়াপদা, চরবাটা, চরজুবলী ও আমানউল্লাহ ইউনিয়নে ধারাবাহিকভাবে মোট ৭টি চক্ষু ক্যাম্প চালু করে। এসব ক্যাম্পে ১,৩১৭ জন রোগীর চক্ষু পরীক্ষা করা হয়, যার মধ্যে ৬৪৪ জন পুরুষ এবং ৬৭৩ জন নারী। পরীক্ষার পর ৫৭৬ জনকে বিনামূল্যে চশমা প্রদান করা হয় এবং ২৯৯ জন ছানি রোগীকে সেবা দেওয়া হয়। পানির সংকটে জরুরি সহায়তা: নোয়াখালী জেলার উপকূলীয় সুবর্ণচর উপজেলার যেসকল ইউনিয়নসমূহে পানির তীব্র সংকট দেখা দিলে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করে সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা। বানভাসীদের সহায়তায় সাগরিকা: ২০২৪ সালে বন্যায় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সংস্থার পক্ষ থেকে নোয়াখালী জেলায় ২৫টি আশ্রয়কেন্দ্রের ৩৪৬৪ জনকে, ফেনী জেলায় ৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্রের ১৭৮০ জনকে, লক্ষীপুর জেলায় ১৫টি আশ্রয়কেন্দ্রের ১৭৮০ জনকে, কুমিল্লা জেলায় ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রের ৬০০ জনকে এবং চট্টগ্রাম জেলায় ০২টি আশ্রয়কেন্দ্রের ১০০ জনসহ মোট ৯৫টি কেন্দ্রে ৭৭২৪ জনকে ত্রান সহায়তা দেয়া হয়।
সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা নির্বাহী পরিচালক মোঃ সাইফুল ইসলাম জানান চার দশকের বেশি সময়ের পথচলায় সাগরিকার কাজের ধরন বদলেছে, বেড়েছে কর্মসূচির বৈচিত্র। তবে মূল লক্ষ্যটি একই থেকেছে প্রান্তিক মানুষের প্রয়োজনের জায়গায় পৌঁছানো এবং তাদের নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করা। উপকূলের বাস্তবতায় এই ধারাবাহিকতাই সাগরিকার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আগামীতে নোয়াখালী অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। এতে সরকারের সহযোগিতার জন্য আহবান জানান।
বিকে/মান্নান

