সিলেটে ‘তৌহিদি জনতার’ ব্যানারে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি
সিলেট ব্যুরো
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১৬:৫৩
ছবি: সংগৃহীত
সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সোনাই নদীতে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানিয়েছে ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে কিছু লোক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লেখালেখির পাশাপাশি সভা করে তারা এ দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার লাউতা ইউনিয়নে লাউতা ও বাহাদুরপুর গ্রামের যুব সমাজের উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে নৌকাবাইচ হয়ে আসছে। এবারও বার্ষিক নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়েছে। ২৮ আগস্ট এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
চলতি বছর নৌকাবাইচের বিষয়টি প্রচার হওয়ার পরপরই এক সপ্তাহ ধরে ‘লাউতা ইউনিয়ন তৌহিদি জনতা’-এর ব্যানারে কিছু ব্যক্তি প্রতিযোগিতাটি বাতিলের দাবি জানিয়ে ফেসবুকে প্রচার চালাচ্ছেন। পাশাপাশি একই ব্যানারে গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় বারইগ্রাম বাজার মসজিদে একটি সভা করেও তারা এ দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় একজন বাসিন্দা জানান, নৌকাবাইচের আয়োজন দেখতে প্রতিবছরই স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের লোকজন আসেন। এ আয়োজন ধরে একটা উৎসবের মতো পরিবেশ তৈরি হয়। অতীতে এমন আয়োজনে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। এবারই আয়োজকেরা বাধার মুখোমুখি হয়েছেন।
লাউতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. দেলওয়ার হোসেন বলেন, ‘ইউএনও মহোদয় দুই পক্ষকে নিয়ে শনিবার বেলা পাঁচটায় তার কার্যালয়ে যেতে বলেছেন। উভয় পক্ষের খোঁজ নিচ্ছি। নিশ্চয়ই আলোচনার ভিত্তিতে বিষয়টির সমাধান হবে।’
বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, বিষয়টা যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, এ রকম নয়। এটা বড় কোনো বিষয় নয়। এখানে ঐতিহ্যগতভাবেই দীর্ঘদিন ধরে নৌকাবাইচ হয়ে আসছে। সম্প্রতি এক ‘হুজুর’ এটা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। বলেছেন, গ্রামীণ এ আয়োজনে প্রায়ই মারামারি হয়। তাই এ প্রতিযোগিতা না হওয়ার দাবি তিনি করেছেন।’
ইউএনও আরও বলেন, ‘নৌকা বাইচের কারণে নদীর পাড়, আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় বছরই মারামারি হয়। গত বছরও মারামারির কারণে বাইচ হয়নি। সেই দিক বিবেচনায় নিয়ে এক পক্ষ চাচ্ছে নৌকাবাইচ বন্ধ হোক। তবে আরেক পক্ষ চাচ্ছে বাইচ হোক। বিষয়টা লোকাল একটা ইস্যু। উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে সমাধানের জন্য স্থানীয় চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিকভাবে অনুমতি নিয়েই আয়োজকদের নৌকাবাইচ করতে হবে। তাই এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে নাকি হবে না, সেটা আমরাও বিবেচনা করে দেখব।’
আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, নৌকা বাইচ সোনাই নদীর তৃগাংগারমুখ এলাকায় অনুষ্ঠিত হবে। এটি সিলেটের বিয়ানীবাজার ও মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার মধ্যে অবস্থিত। প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আগামী শুক্রবার দুপুর ১২টার মধ্যে নৌকা নাম নিবন্ধন করতে হবে। প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার হিসেবে একটি বড় আকারের গরু এবং দ্বিতীয় পুরস্কার হিসেবে একটি ছাগল উপহার দেওয়া হবে।
১৫ থেকে ২০ বছর ধরে সোনাই নদীতে নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। প্রতিযোগিতার আয়োজক কমিটির সদস্য আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মুষ্ঠিমেয় কিছু ব্যক্তি আয়োজনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ করছেন। তবে লাউতা ইউনিয়নের মুরব্বিরা দুই পক্ষকে নিয়ে শনিবার বিকেলে বৈঠক করবেন। সবাই নৌকা বাইচ আয়োজনের পক্ষে আছেন। যথাসময়ে নৌকা বাইচ হবে, এমনটাই আশা করছি।’
বারইগ্রাম বাজার মসজিদে আয়োজিত সভার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে তিনজনকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়।
ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, নৌকা বাইচের নামে একটা জুয়ার আসর বসানোর চেষ্টা হচ্ছে। এলাকার যুবকদের নৈতিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এ আয়োজনে নদী ভাঙনও হয়। নদীর পাড় ভাঙে, রাস্তা ছোট হয়। ধর্মপ্রাণ মানুষজন এমন আয়োজন চান না। এ ছাড়া এ ধরনের আয়োজনে রাস্তায় যানজট দেখা দেয়। রোগীদের রাস্তা দিয়ে নেওয়া তখন কঠিন হয়ে পড়ে।
আরেকজন বক্তা বলেন বলেন, এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা রোধ করতেই নৌকা বাইচ বন্ধ রাখা উচিত। কয়েক বছর আগে এ ধরনের আয়োজনকে কেন্দ্র করে খুন হন এক নারী। মারামারি হয়, নৌকা ভাঙা হয়। এ কারণে ইউনিয়নবাসীর অনেক দুর্নাম হয়। একটা স্বার্থান্বেষী মহল নৌকা বাইচ সামনে এনে তাদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। নৌকা বাইচের মাধ্যমে কৃষকেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাদের চারাগাছ বিনষ্ট হয়। এ ছাড়া আয়োজন ঘিরে মারামারিরও আশঙ্কা আছে। তাই নৌকা বাইচ বন্ধ করা উচিত।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

