কাগজে-কলমে শতভাগ অর্থ ব্যয় ও কোটি কোটি টাকার কেনাকাটার মহোৎসব দেখানো হলেও বাস্তবে চরম ওষুধ সংকটে ধুঁকছে নওগাঁর সরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলার ১১টি সরকারি হাসপাতালে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল এবং পুরো অর্থই খরচ দেখানো হয়েছে। কিন্তু সরকারি এই বিশাল ব্যয়ের সুফল মিলছে না সাধারণ রোগীদের ভাগ্যে। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে হাসপাতালেও এসেও অধিকাংশ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে হতদরিদ্র রোগীদের। একই সঙ্গে চরম বেহাল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পুরোনো যন্ত্রপাতি আর জরাজীর্ণ অবকাঠামো মিলিয়ে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো এখন নিজেই রোগীতে পরিণত হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত অর্থবছরে নওগাঁর ১০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনুকূলে প্রায় ২২ কোটি টাকা এবং নওগাঁ সদর হাসপাতালের জন্য ২৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রশাসনিক নথিপত্রে এই পুরো ৫০ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।
ই-টেন্ডারের মাধ্যমে জীবনরক্ষামূলক ওষুধ, গজ, ব্যান্ডেজ, কটন, রাসায়নিক বিকারক (রিএজেন্ট), লিনেন (বেডশিট ও কাপড়) এবং বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী বা আসবাবপত্র ক্রয়ের কথা বলা হয়েছে নথিতে। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বাস্থ্য বিভাগের এই ‘কাগুজে বরাদ্দের’ সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে।
সরেজমিন চিত্র: বেহাল মান্দা থেকে সদর হাসপাতাল
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু ওষুধ সংকটই নয়, জেলার হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক।
মান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: এই হাসপাতালের ড্রেনেজ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অকার্যকর ও বেহাল। সামান্য বৃষ্টিতেই হাসপাতাল চত্বরে দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা-আবর্জনা ও পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল এবং দেওয়ালে শ্যাওলার আস্তরণ পড়ে আছে।
মান্দার পাশাপাশি আত্রাই, ধামইরহাট ও নওগাঁ সদর হাসপাতালেও একই ধরনের করুণ চিত্র দেখা গেছে। এসব হাসপাতালের অধিকাংশ বেড ও চাদর পুরোনো ও ময়লাযুক্ত। জরাজীর্ণ স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে রোগী ও তাদের স্বজনদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
রোগীদের অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে সদুত্তর দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা। নওগাঁ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আ. ম. আখতারুজ্জামান বরাদ্দের গরমিলের বিষয়ে দায়সারা মন্তব্য করে বলেন, “গত বছরের ২৮ কোটি টাকার বরাদ্দ পর্যাপ্ত ছিল না।” তবে নতুন অর্থবছরে তাঁর হাসপাতাল আরও বড় অঙ্কের—প্রায় ৪৮ কোটি টাকার বরাদ্দ পেয়েছে এবং শিগগিরই নতুন কেনাকাটা শুরু হবে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, আগের অর্থবছরের ২৮ কোটি টাকার ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী যদি সত্যিই কেনা হয়ে থাকে, তবে রোগীরা কেন তার সুফল পেলেন না? কেন প্রতিটি ব্যবস্থাপত্রের জন্য তাঁদের বাইরের ফার্মেসির শরণাপন্ন হতে হচ্ছে?
এ বিষয়ে নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. মো. আমিনুল ইসলাম ও মান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বললেও সুনির্দিষ্ট কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
স্থানীয় সচেতন মহল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, সরকারি অর্থে কেনা চিকিৎসাসামগ্রী ও ওষুধের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে নামমাত্র কেনাকাটা দেখিয়ে অর্থ লোপাট করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত টিম গঠন করা জরুরি। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো সংস্কার এবং ওষুধ সরবরাহে হরিলুট বন্ধে অবিলম্বে কার্যকর নজরদারি দাবি করেছেন তাঁরা।
বিকে/মান্নান

