অসৌজন্যমূলক আচরণ
বিআরটিসি গাজীপুর কেন্দ্রে সাংবাদিক প্রবেশে বাধা
ফ্রি আবেদনে ৫ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ
গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ২৩:৩৮
ছবি: সংগৃহীত
গাজীপুরের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিককে মূল অফিসে প্রবেশে বাধা এবং সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে।
একই সঙ্গে ফ্রি প্রশিক্ষণের আবেদন ও ভর্তির নামে পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাপ্রার্থী। সরকারি সেবা হিসেবে বিনামূল্যে আবেদনের সুযোগ থাকার পরও টাকা নেওয়ার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ও অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) অফিস চলাকালে সাংবাদিক ইউনিয়ন গাজীপুরের সভাপতি, গাজীপুর প্রেসক্লাবের তত্ত্বাবধায়কমণ্ডলীর সিনিয়র সদস্য ও দৈনিক দিনকালের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক দেলোয়ার হোসেন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ও ভর্তি-সংক্রান্ত তথ্য জানতে কেন্দ্রে গেলে তাকে গেটেই আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ। পরে তাকে গেটের পাশে থাকা নিরাপত্তাকর্মীদের কক্ষে বসতে দেওয়া হয়।
ট্রেনিং ম্যানেজার প্রকৌশলী মশিউজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলে নিরাপত্তাকর্মী ফারুক তাকে জানান, ২০২৪ সালের একটি আদেশ অনুযায়ী পরিচালকের অনুমতি ছাড়া কোনো গণমাধ্যমকর্মীকে অফিসের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। পরে সাংবাদিকের সঙ্গে মশিউজ্জামানের সাক্ষাতের বিষয়টি নিরাপত্তাকর্মী ভেতরে জানালে মশিউজ্জামান তাকে অফিসে না এনে নিজেই নিরাপত্তাকর্মীদের কক্ষে আসবেন বলে জানান।
কিছুক্ষণ পর তিনি সেখানে এসে নিরাপত্তাকর্মীর চেয়ারে বসেন। সাংবাদিক দেলোয়ার হোসেনের অভিযোগ, এ সময় মশিউজ্জামান উচ্চস্বরে ‘কী বলতে চান, কী জানতে চান’-এভাবে কথা বলেন। সাংবাদিক জানান, তিনি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ও ভর্তি-সংক্রান্ত তথ্য জানতে এসেছেন। বিশেষ করে ফ্রি প্রশিক্ষণের আবেদন ও ভর্তির ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার টাকা নেওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে কর্মকর্তা কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে রাগান্বিত হয়ে ওঠেন এবং চেয়ার ধাক্কা দিয়ে উঠে চলে যান বলে অভিযোগ। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে পড়েন সাংবাদিক দেলোয়ার হোসেন।
তার ভাষ্য, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে তথ্য সংগ্রহের জন্য গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন আচরণ তিনি প্রত্যাশা করেননি।
এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হলে পরে আরও কয়েকজন সাংবাদিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রে গেলে সেখানে প্রশিক্ষণ নিতে আসা কয়েকজন সেবাপ্রার্থী তাদের কাছে নানা ভোগান্তির কথা জানান। তাদের কয়েকজনের অভিযোগ, ফ্রি প্রশিক্ষণের আবেদন বা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে নির্ধারিত কোনো ফি না থাকার পরও তাদের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে।
কেউ কেউ আরও দাবি করেন, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সেবা নিতে গিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে। ফ্রি আবেদনের ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি সেবার নামে অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সরকারি নির্দেশনা, ভর্তি বিজ্ঞপ্তি, নির্ধারিত ফি, অর্থ গ্রহণের রসিদ এবং প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে বাস্তবে নেওয়া টাকার হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ কোন প্রশিক্ষণ ফ্রি, কোন প্রশিক্ষণে নির্ধারিত ফি রয়েছে এবং কোন খাতে টাকা নেওয়া হচ্ছে— এগুলো নথিপত্রের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়ার কথা। প্রশ্ন হলো, ফ্রি আবেদনের নামে যদি পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হয়ে থাকে, সেই অর্থ কোন খাতে নেওয়া হচ্ছে, কার নির্দেশে নেওয়া হচ্ছে এবং এর বিপরীতে সরকারি রসিদ দেওয়া হচ্ছে কি না।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির মূল গেট সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকদের জন্য সব সময়ই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে। গুনে গুনে লোকজনকে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয় এবং কারা প্রবেশ করবেন, সে বিষয়ে নিরাপত্তাকর্মীরাই সিদ্ধান্ত নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে একটি সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে সেবাপ্রার্থী ও গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশাধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতাপূর্ণ পরিবেশ চলে আসছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, আগের সময়ের প্রশাসনিক সংস্কৃতির প্রভাব এখনো রয়ে গেছে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তির বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায় না। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করার সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৬০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত। এত বড় একটি সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণার্থী ভর্তি, ফ্রি প্রশিক্ষণের আবেদন, ফি গ্রহণ, অর্থ লেনদেন, সেবা প্রদান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা খতিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষ করে ফ্রি প্রশিক্ষণের আবেদন যদি সত্যিই বিনামূল্যে করার কথা থাকে, তাহলে পাঁচ হাজার টাকা কার নির্দেশে, কোন খাতে এবং কীসের বিনিময়ে নেওয়া হচ্ছে— এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার কথিত ২০২৪ সালের আদেশটি কী, তার আওতা কতটুকু এবং সেটি বর্তমানে কার্যকর আছে কি না— সেটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য প্রবেশনীতি থাকতে পারে; কিন্তু সেই নীতির প্রয়োগ যদি তথ্য সংগ্রহ ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের ক্ষেত্রে অযথা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, তাহলে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এমনটি বলছেন ভোক্তভোগীরা।
অনেকের মতে, সাংবাদিক দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি তাই শুধু একজন সাংবাদিককে গেটে আটকে রাখার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, গণমাধ্যমের সঙ্গে আচরণ এবং সেবাপ্রার্থীদের অধিকার।
গেটের প্রবেশনীতি, প্রশিক্ষণার্থী ভর্তি, ফ্রি আবেদনের নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ, অন্যান্য সেবায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ এবং কর্মকর্তাদের আচরণ—সবকিছু একসঙ্গে খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে ট্রেনিং ম্যানেজার প্রকৌশলী মশিউজ্জামানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া না দেওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

