একটি সড়ক দুর্ঘটনা। এরপর কেটে গেছে আটটি দিন। হাসপাতালের আইসিইউর দরজার দিকে তাকিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত পার করছেন স্বজনরা। কখন চিকিৎসক এসে বলবেন—তাজিমের জ্ঞান ফিরেছে,সেই অপেক্ষাতেই দিন-রাত কাটছে পরিবারের। কিন্তু সেই অপেক্ষার এখনো শেষ হয়নি। বান্দরবান থেকে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার টুপিপাড়া গ্রামের সন্তান তাজিম হোসেন (২০) তিনি এবার শ্রীপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেজে এইচ এসসি পরীক্ষা দিয়েছেন।
গত ৩১ আগস্ট বিকেল ৪টার দিকে বান্দরবান থেকে ফেরার পথে গাড়ি থেকে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন তাজিম। মুহূর্তেই বদলে যায় তাঁর পরিবারের সব হিসাব-নিকাশ। যে ছেলেটি হাসিমুখে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, তাকেই শেষ পর্যন্ত গুরুতর আহত অবস্থায় নিতে হয়েছে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে।
দুর্ঘটনায় তাজিমের মাথা, কপাল ও মুখে গুরুতর আঘাত লাগে। প্রথমে বান্দরবান ও পরে চট্টগ্রামে তাঁর চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় নেওয়া হয়। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।
দুর্ঘটনার পর আট দিন পার হয়ে গেলেও এখনো তাজিমের জ্ঞান ফেরেনি। হাসপাতালের বিছানায় অচেতন ছেলেকে দেখে স্বজনদের বুক ভার হয়ে আসে। তবু আশা ছাড়ছেন না তাঁরা। চিকিৎসকদের প্রচেষ্টা আর সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করেই প্রতিটি মুহূর্ত পার করছেন পরিবারের সদস্যরা।
তাজিমের বাবা লিটন মিয়া বলেন, আজ আট দিন ধরে আমার ছেলে একই অবস্থায় আছে। এখনো তার জ্ঞান ফেরেনি। তবে মাঝে একবার হাত একটু নড়াচড়া করেছিল, সেটাও অচেতন অবস্থায়। আল্লাহর কাছে আমার একটাই চাওয়া—আমার ছেলেকে যেন সুস্থভাবে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেন।
বাবার কথায় যেন আটকে আছে একজন সন্তানের জন্য একজন বাবার সমস্ত আকুতি। ছেলের চোখ খুলবে—এই আশাতেই হাসপাতালের প্রতিটি মুহূর্ত গুনছেন তিনি। চিকিৎসার পাশাপাশি এখন পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসা স্বজন, বন্ধু ও মানুষের সহযোগিতা।
তাজিমের বন্ধু মিসকাত বলেন, তাজিম খুব ভালো একটা ছেলে। আমরা সবাই তার জন্য দোয়া করছি। আমাদের একটাই চাওয়া—তাজিম যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসে।
শৈশব নামে এক বন্ধু বলেন, তাজিমের চিকিৎসার জন্য আমরা বন্ধুরা মিলে আর্থিক সহযোগিতার চেষ্টা করছি। এ জন্য শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিষয়টিও জানানো হয়েছে। আশা করছি, তারাও তাজিমের চিকিৎসায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন।
তিনি আরও বলেন, তাজিমের জন্য এখন সবার সহযোগিতা দরকার। আমরা চাই না অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা ব্যাহত হোক। সবাই যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ালে হয়তো তাজিম আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসবে।
তাজিমের আরেক বন্ধু সজল বলেন, তাজিম অত্যন্ত ভদ্র একটা ছেলে। সে দীর্ঘদিন আমাদের রোভার স্কাউটের সঙ্গে ছিল। নিজের কাজ অত্যন্ত সততা ও দায়িত্বের সঙ্গে করত। এমন একটা ছেলে আজ হাসপাতালে অচেতন হয়ে পড়ে আছে—এটা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। আমরা সবাই তার জন্য দোয়া করছি।
তাজিমের বন্ধুদের ভাষ্য, শুধু একজন বন্ধু হিসেবে নয়, রোভার স্কাউটের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে অনেকের কাছেই পরিচিত ও প্রিয় ছিলেন তিনি। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তাঁর পরিচিতজনেরা উদ্বিগ্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাজিমের সুস্থতার জন্য দোয়া ও সহযোগিতার আহ্বান জানাচ্ছেন অনেকে।
তবে দীর্ঘ চিকিৎসায় বাড়ছে পরিবারের আর্থিক চাপও। একদিকে প্রিয় মানুষটির জীবন বাঁচানোর লড়াই, অন্যদিকে চিকিৎসার ব্যয়—দুই দিক সামলাতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে পরিবার। তাই তাজিমের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতা চেয়েছেন স্বজন ও বন্ধুরা।
পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাশা, মানুষের সহায়তায় তাজিমের চিকিৎসা নির্বিঘ্নে চলবে। আর একদিন হাসপাতালের সেই দরজা পেরিয়ে চিকিৎসক এসে বলবেন—‘তাজিমের জ্ঞান ফিরেছে।’ সেই একটি খবরের অপেক্ষাতেই এখন দিন গুনছে পুরো পরিবার।
তাজিমের বাবা বারবার সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই প্রার্থনা করছেন—ছেলের চোখ যেন আবার খুলে যায়, তাজিম যেন আবার কথা বলে, আবার ফিরে আসে আপনজনদের মাঝে।
শ্রীকোল ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান কুলসুম খাতুন বলেন, ছেলেটির পরিবার খুবই দরিদ্র। সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর তার চিকিৎসার ব্যয় বহন করা পরিবারের পক্ষে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। দুর্ঘটনার খবর জানার পর আমি আমার সাধ্যমতো ব্যক্তিগতভাবে তাকে আর্থিক সহযোগিতা করেছি।
কুলসুম খাতুন বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের ফান্ডে অর্থ না থাকায় পরিষদের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা করা সম্ভব হয়নি। আমি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও কথা বলেছি এবং ছেলেটির চিকিৎসার জন্য যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি
তাজিমের পরিবার ও বন্ধুরা তার দ্রুত সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া ও প্রার্থনা কামনা করেছেন। পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
তাজিমের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা পাঠানোর নম্বর: বিকাশ ও নগদ (পার্সোনাল): ০১৮০৬৩৫৪২৩১
বিকে/মান্নান

