Logo

সারাদেশ

৫২ দিন পর মধ্যপাড়া খনিতে পাথর উত্তোলনে গতি

Icon

দিনাজপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৪৯

৫২ দিন পর মধ্যপাড়া খনিতে   পাথর উত্তোলনে গতি

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ কঠিন শিলা খনি মধ্যপাড়ায় ৫২ দিন বন্ধ থাকার পর পাথর উত্তোলন আবার শুরু হয়েছে। বিস্ফোরক সংকটে গত ১৯ মে থেকে উৎপাদন বন্ধ থাকার পর ১১ জুলাই থেকে পুনরায় পাথর উত্তোলন শুরু করে খনির উৎপাদন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া-ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)। পরবর্তী সময়ে উৎপাদন ও পাথর বিক্রি বাড়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।

খনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ভূগর্ভে পাথর উত্তোলনের জন্য ব্যবহৃত অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় ১৯ মে থেকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরে নতুন করে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের চালান খনিতে পৌঁছালে ১১ জুলাই উৎপাদন শুরু হয়। মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (এমজিএমসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ হোসেন সে সময় জানিয়েছিলেন, থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা ৮৮ মেট্রিক টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট খনিতে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক সংকটের কারণে চালান পেতে দেরি হয়েছিল বলেও তিনি জানান।

টানা ৫২ দিন উৎপাদন বন্ধ থাকার ঘটনায় খনির বিস্ফোরক সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ পাথর উত্তোলনের মতো কার্যক্রমে অপরিহার্য এই উপকরণের মজুত ও সরবরাহ কতটা ধারাবাহিক রাখা যায়, সেটি খনির উৎপাদন পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

এদিকে ২৫ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, উৎপাদন পুনরায় শুরু হওয়ার পর মধ্যপাড়া খনিতে জিটিসির পাথর উৎপাদন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে পাথর বিক্রিও বেড়েছে। খনি থেকে উত্তোলিত পাথরের বড় অংশ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে যাচ্ছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জিটিসি প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন পাথর উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে।

তবে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি পাথর বিক্রির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মধ্যপাড়া খনিতে প্রায় ১৫ লাখ টন অবিক্রীত পাথর থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়। মে মাসের একটি প্রতিবেদনে খনির পাথর সংরক্ষণের ধারণক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ ৭৫ হাজার টন এবং অবিক্রীত পাথরের পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ ৭০ হাজার টন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। আগস্টেও অবিক্রীত পাথরের পরিমাণ প্রায় ১৫ লাখ টন বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

ফলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদিত পাথরের বাজার নিশ্চিত করাও খনিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে উৎপাদন ও বিক্রির মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে খনির স্ট্যাক ইয়ার্ডে পাথরের মজুত বাড়তে পারে।

খনির উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি একটি চুক্তিও। এমজিএমসিএলের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর ছয় বছর মেয়াদি চুক্তিতে জিটিসির ১৪টি স্টোপ উন্নয়নের মাধ্যমে ৮৮ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন পাথর উৎপাদনের কথা রয়েছে।

এই চুক্তির ক্ষেত্রে নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এখন পর্যন্ত প্রকৃত উৎপাদন কত হয়েছে, চুক্তির সময়সূচি অনুযায়ী অগ্রগতি কতটা এবং উৎপাদন বন্ধ থাকার সময়ের প্রভাব কী এসব তথ্য খনির সামগ্রিক কার্যক্রম মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে পাথর পরিবহনও মধ্যপাড়া খনির দীর্ঘদিনের একটি বিষয়। ভবানীপুর থেকে মধ্যপাড়া পর্যন্ত রেলপথে পাথর পরিবহন প্রায় ১৫ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে বর্তমানে সড়কপথে পাথর পরিবহনের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভবানীপুর-মধ্যপাড়া রেলপথ সংস্কারের জন্য প্রায় ১৩৪ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়ার তথ্য জানানো হয়।

রেলপথটি সংস্কার করে পুনরায় চালু করা হলে খনি থেকে পাথর পরিবহনের ক্ষেত্রে একটি বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বড় পরিমাণ পাথর পরিবহনের সুযোগ তৈরি হলে বাজার সম্প্রসারণেও এর ভূমিকা থাকতে পারে। তবে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও রেলপথ চালুর সময়সূচি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের ওপর।

সব মিলিয়ে মধ্যপাড়া খনিতে বর্তমানে উৎপাদন চালু রয়েছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি পাথর বিক্রির পরিমাণ, মজুতের পরিস্থিতি, বিস্ফোরকের সরবরাহ এবং পরিবহনব্যবস্থা এসব বিষয়ও খনিটির ভবিষ্যৎ উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ কঠিন শিলা খনি হিসেবে মধ্যপাড়ার উৎপাদন ধারাবাহিক রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি উৎপাদিত পাথরের বাজার নিশ্চিত করাও জরুরি। বিস্ফোরকের সরবরাহে পুনরায় কোনো ঘাটতি তৈরি না হওয়া, উৎপাদন ও বিক্রির মধ্যে সমন্বয় রাখা এবং রেলপথ চালুর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে খনিটির উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি চুক্তির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা, প্রকৃত উৎপাদন ও আর্থিক হিসাব নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হলে খনিটির কার্যক্রম মূল্যায়ন আরও সহজ হবে।

বিকে/মান্নান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন