Logo

সারাদেশ

ভালুকায় খামারে পড়ে আছে ৪০০ কুমির, চামড়া রপ্তানি বন্ধ

Icon

রোমান আহমেদ নকিব, ভালুকা (ময়মনসিংহ)

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৪৮

অ
ভালুকায় খামারে পড়ে আছে ৪০০   কুমির,  চামড়া রপ্তানি বন্ধ

একসময় কুমিরের চামড়া রপ্তানি করে আসত ডলার। খামারে বেড়ে ওঠা কুমিরগুলোকে ঘিরে ছিল বড় স্বপ্ন—দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসবে, তৈরি হবে কর্মসংস্থান, গড়ে উঠবে সম্ভাবনাময় একটি রপ্তানিশিল্প। সেই স্বপ্ন থেকেই দুই দশক আগে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হাতিবেড় গ্রামে ১৩ দশমিক ৪০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছিল কুমিরের খামার রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড।

২০০৪ সালে মালয়েশিয়া থেকে ৭৫টি কুমির এনে শুরু হয়েছিল খামারটির যাত্রা। কয়েক বছরের মধ্যেই সাফল্য পেতে শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে কুমিরের চামড়া রপ্তানির অনুমতি ও বাজারজাতকরণ নিয়ে শুরুতে নানা জটিলতা দেখা দেয়। পরে সেই সংকট কাটিয়ে ২০১৪ সালে প্রথম চালানে প্রায় ৪৫০টি কুমিরের চামড়া বিদেশে রপ্তানি করা হয়। এতে দেশে আসে আড়াই লাখ ডলার।

এরপর জাপানের বাজারে নিয়মিত কুমিরের চামড়া রপ্তানি হতে থাকে। প্রথম পাঁচ বছরে রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড থেকে জাপানে রপ্তানি করা হয় মোট ১ হাজার ৫০৭টি কুমিরের চামড়া। প্রতিটি চামড়ার আন্তর্জাতিক বিক্রয়মূল্য ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার। 

কিন্তু সেই সাফল্য বেশিদিন টেকেনি। ২০২০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আর কোনো কুমিরের চামড়া রপ্তানি হয়নি। একসময় যে কুমিরগুলোকে ঘিরে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, সেগুলো এখন খামারের ভেতরেই পড়ে আছে। খাবার, পরিচর্যা ও চিকিৎসার সংকটে কুমিরগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

রেপটাইলস ফার্মের রপ্তানি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ৪৩০টি কুমিরের চামড়া জাপানে রপ্তানি করা হয়। পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৫ সালে রপ্তানি হয় ৪০০টি। ২০১৬ সালে ২০০টি, ২০১৮ সালে ২২৬টি এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালে ২৫১টি কুমিরের চামড়া রপ্তানি করা হয়। সব মিলিয়ে প্রথম পাঁচ বছরে রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৫০৭টি চামড়া। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিটি চামড়ার মূল্য ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার। সেই হিসাবে কুমিরের চামড়া রপ্তানি করে খামারটি বড় ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। কিন্তু ২০১৯ সালের পর সেই ধারাবাহিকতা থেমে যায়। ২০২০ সাল থেকে কোনো কুমিরের চামড়া রপ্তানি হয়নি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ছয় সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ ও উদ্দীপন নামের একটি এনজিও খামারটির পরিচালনায় আসার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে কুমিরের চামড়া রপ্তানি করা সম্ভব হয়নি।

২০২৩ সালের মে মাসে রেপটাইলস ফার্ম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, খামারে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩ হাজার ৭০০টি কুমির রয়েছে। ওই সময় প্রায় ৪০০টি কুমিরের চামড়া রপ্তানির উপযোগী ছিল। এরপর তিন বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে একটি কুমিরের চামড়াও বিদেশে রপ্তানি হয়নি। কিন্তু বর্তমানে খামারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যেও রপ্তানিযোগ্য কুমিরের সংখ্যা প্রায় ৪০০টি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একটি কুমির জন্মের তিন বছরের মধ্যে চামড়া রপ্তানির উপযোগী হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চামড়া রপ্তানি বন্ধ থাকায় খামারের কুমিরগুলোর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। শুধু রপ্তানিই বন্ধ হয়নি, কুমিরগুলোর পরিচর্যাতেও তৈরি হয়েছে সংকট। খাবারের অভাব ও যথাযথ পরিচর্যা না থাকায় কুমিরগুলোর বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে বলে জানা গেছে।

একসময় রেপটাইলস ফার্মে কাজ করতেন ২০ জন। কুমিরের খাবার দেওয়া, পরিচর্যা, খামার পরিষ্কার রাখা এবং অন্যান্য কাজে তাঁরা যুক্ত ছিলেন। কিন্তু ২০২৩ সালে উদ্দীপন জমি ও কুমির কিনে নেওয়ার পর কর্মীর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। বর্তমানে সেখানে কাজ করছেন মাত্র ১০ জন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, বিপুলসংখ্যক কুমিরের নিয়মিত পরিচর্যার জন্য এই জনবল যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে খাবার ও চিকিৎসার সংকট যুক্ত হওয়ায় কুমিরগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। তবে উদ্দীপনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিষেধ থাকায় কুমির লালন-পালনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ফার্মের কেউ এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।

রেপটাইলস ফার্মের বর্তমান সংকটের পেছনে মালিকানা পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও রয়েছে। ২০১২ সালে মুশতাক আহমেদ ও মেজবাউল হক রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেডের শেয়ার বিক্রি করে দেন পিকে হালদারের কাছে। পরে পিকে হালদার ইন্টারন্যাশনাল লিজিং প্রতিষ্ঠানের কাছে কুমিরের খামারটি বন্ধক রেখে টাকা উত্তোলন করেন।

২০১৯ সালে পিকে হালদার অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় অভিযুক্ত হন। তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নিয়ে তখন নানা আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ কুমিরের খামার পরিচালনার জন্য ছয় সদস্যের একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। পরে ওই পরিচালনা পর্ষদ ২০২৩ সালে নিলামের মাধ্যমে রেপটাইলস ফার্মের জমি ও কুমির ৩৮ কোটি ২০ লাখ টাকায় উদ্দীপন নামের একটি এনজিওর কাছে বিক্রি করে দেয়। এর পর থেকে খামারটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে উদ্দীপন।

কুমির লালন-পালনের ক্ষেত্রে লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। লাইসেন্স ছাড়া কুমির লালন-পালন, খামার স্থাপন কিংবা আমদানি-রপ্তানি করা যাবে না—সরকারি নীতিমালায় বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

২০১৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪ নম্বরে বলা হয়েছে, কোনো খামারি বিধিমালার অধীন লাইসেন্স গ্রহণ ছাড়া কুমির লালন-পালন, খামার স্থাপন কিংবা আমদানি-রপ্তানি পরিচালনা করতে পারবেন না। একই অধ্যায়ের ৭-এর ১ নম্বরে বলা হয়েছে, লাইসেন্স পাওয়ার পর কোনো খামারি পজেশন সার্টিফিকেট ছাড়া কুমির নিজ মালিকানায় বা দখলে রাখতে পারবেন না।

বন বিভাগের কুমির লালন-পালনের নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি কুমিরের জন্য বছরে ১ হাজার টাকা পজেশন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। কুমির পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অবশ্য মনে করেন, এই পজেশন ফি ব্যবসাটির জন্য একটি প্রতিবন্ধকতা।

অভিযোগ রয়েছে, উদ্দীপন গত তিন বছর ধরে লাইসেন্স ছাড়াই রেপটাইলস ফার্মের কুমির পালন করছেন। বিষয়টি নিয়ে বন বিভাগের বক্তব্য জানতে চাইলে বন সংরক্ষক (বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল) ছানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, উদ্দীপনের লোকজন একবার তাঁর কাছে এসেছিলেন। তখন তাঁদের ফার্মটি হস্তান্তরের সঠিক কাগজপত্রসহ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু এরপর আর তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি।

তবে উদ্দীপনের লাইসেন্স না থাকলেও কুমিরগুলো অবৈধ নয় বলে জানিয়েছেন এই বন কর্মকর্তা।

ছানাউল্যা পাটওয়ারীর ভাষ্য, ‘উদ্দীপনের লাইসেন্স না থাকলেও প্রাণীগুলো অবৈধ নয়, যেহেতু রেপটাইলস ফার্মের নামে লাইসেন্সে আছে।’

ভালুকার হাতিবেড়ের ১৩ দশমিক ৪০ একর জমিতে দুই দশক আগে যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, তার সামনে ছিল বড় সম্ভাবনা। মালয়েশিয়া থেকে আনা ৭৫টি কুমির থেকে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা খামারের কুমির একসময় জাপানের বাজারে জায়গা করে নেয়। কয়েক বছরে রপ্তানি হয় ১ হাজার ৫০৭টি চামড়া, দেশে আসে বৈদেশিক মুদ্রা।

একটি চামড়ার মূল্য যখন ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার, তখন খামারটির সম্ভাবনা যে কতটা ছিল, তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু সেই সম্ভাবনাই এখন কাজে লাগছে না।

ছয় বছর ধরে চামড়া রপ্তানি বন্ধ। রপ্তানির উপযোগী প্রায় ৪০০ কুমির এখনও খামারে রয়েছে। কর্মী কমেছে অর্ধেকে। খাবার ও পরিচর্যার সংকট রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও লাইসেন্সের জটিলতা। 

ফলে একসময় যে কুমিরগুলোকে বলা হতো ‘ডলারের ডিমপাড়া’, সেই কুমিরগুলোর ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। 

বিকে/মান্নান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন