দেশের অন্যতম প্রধান ধান-চাল উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁয় আউশ ধানের বাম্পার ফলন হলেও বাজারদরের ধসে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষক। উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের দাম কমে যাওয়ায় অনেক চাষিকে লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক, ডিজেল, শ্রমিকের মজুরি, কাটা-মাড়াই ও পরিবহন খরচ বাড়লেও ধানের বাজারদর উল্টো কমেছে। এতে কৃষকের লাভ তো দূরের কথা, অনেকের উৎপাদন খরচই উঠছে না।
নওগাঁর বিভিন্ন হাট ও মোকামে খোঁজ নিয়ে এবং সাম্প্রতিক বাজারতথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জিরাশাইল, কাটারি ও ব্রি-২৮ জাতের ধান কয়েক সপ্তাহ আগে মণপ্রতি ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকা দরে বিক্রি হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন হাটে আউশের কিছু জাত ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় নেমে এসেছে। গত বছরের তুলনায় জাতভেদে মণপ্রতি ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত কমার কথা জানিয়েছেন কৃষকেরা।
বদলগাছী উপজেলার মাতাজিহাটসহ বিভিন্ন বাজারে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বিঘা জমিতে আউশ ধান উৎপাদনে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। গড়ে ১৬ মণ ধান উৎপাদন হলেও ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করলে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচই পুরোপুরি উঠে আসছে না। এর সঙ্গে জমির বর্গা, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হলে প্রকৃত লোকসান আরও বাড়ছে।
মহাদেবপুর উপজেলার চালবুলি গ্রামের কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, “চলতি মৌসুমে সার, বীজ, ডিজেল ও শ্রমিকের খরচসহ প্রতি বিঘায় প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। ফলন হয়েছে ১৬ থেকে ১৮ মণ। কিন্তু হাটে ধানের দাম কম থাকায় উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
বদলগাছী উপজেলার কৃষক রহিম উদ্দিন বলেন, “গত বছর যে জিরা ধানের ভালো দাম পাওয়া গিয়েছিল, এবার একই ধরনের ধান অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচ যেভাবে বেড়েছে, ধানের দাম সেভাবে না বাড়লে কৃষকের পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।”
একই উপজেলার কৃষক আব্দুস সাত্তারও একই অভিযোগ করেছেন। ৭৫০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ উঠছে না বলে জানান তিনি। এলাকার বর্গাচাষি মস্তফা ১০ বিঘা জমিতে আউশ চাষ করে জমির মালিকের অংশ, উৎপাদন ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে লোকসানের মুখে পড়ার কথা জানিয়েছেন।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধান ঘরে তোলার পরপরই তাঁদের নানা ধরনের আর্থিক দায় পরিশোধ করতে হয়। সার-বীজের দোকানের বকেয়া, কৃষিঋণ, শ্রমিকের মজুরি, জমির বর্গা এবং পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে অনেকেই ধান ধরে রাখতে পারেন না। ফলে বাজারদর কম থাকলেও বাধ্য হয়ে হাটে ধান নিয়ে আসছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদনের সময় তাঁদের কোনোভাবেই বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকে না। ফসল বিক্রির সময় মধ্যস্বত্বভোগী ও ক্রেতাদের নির্ধারিত দামেই ধান বিক্রি করতে হয়। এতে উৎপাদনের সব ঝুঁকি কৃষকের ওপর পড়লেও বাজারদর নির্ধারণে তাঁদের কোনো ভূমিকা নেই।
কৃষকদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মাঠে ধানের দাম কমে গেলে চালের বাজারে তার প্রভাব পড়ে না কেন?
নওগাঁর চালকল মালিকদের বক্তব্য, চালের বাজারের চাহিদা, মজুত, পরিবহন ব্যয় এবং ধানের ক্রয়মূল্যের ওপর ভিত্তি করেই মিল পর্যায়ে ধান কেনা হয়। বাজারে চাল বিক্রি ধীর হলে মিলারদের নতুন ধান কেনার সক্ষমতা ও আগ্রহও কমে যায়।
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, চালকল শিল্পের সংকটের সঙ্গে কৃষকের অবস্থাও সরাসরি সম্পর্কিত। তিনি জানান, মিলারদের বিরুদ্ধে অনিয়মের যেসব ঢালাও অভিযোগ ওঠে, সব ক্ষেত্রে তার সত্যতা থাকে না।
তবে কৃষকদের বক্তব্য, ধানের বাজারে যদি সরবরাহ বেশি থাকে এবং মিলাররা কম দামে ধান কেনেন, তাহলে উৎপাদনকারী কৃষকের লোকসান কমানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
কৃষকদের দাবি, শুধু বাজার তদারকি করে ধানের দরপতন ঠেকানো সম্ভব নয়। মৌসুমের শুরুতেই প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার পরিমাণ বাড়াতে হবে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে প্রকৃত কৃষক যাচাই করে সরাসরি ধান সংগ্রহ করা হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন।
একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে ধানের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি উপকরণে সহায়তা এবং ধান সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত গুদাম সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
চলতি মৌসুমে নওগাঁয় আউশের আবাদ ও ফলন ভালো হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য ও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, জেলায় আউশ আবাদ হয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে এবং চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৭৯ মেট্রিক টন।
উৎপাদন বাড়লেও তার সুফল কৃষকের পকেটে যাচ্ছে না। বরং বাজারে সরবরাহ বাড়ার সময়ই ধানের দর কমে যাওয়ায় উৎপাদনের পুরো ঝুঁকি কৃষককেই বহন করতে হচ্ছে।
কৃষকদের বক্তব্য, মাঠে তাঁরা কম দামে ধান বিক্রি করলেও ভোক্তা পর্যায়ে চালের দাম সেই অনুপাতে কমে না। ফলে ধান উৎপাদনকারী কৃষক এবং চাল ক্রয়কারী সাধারণ ভোক্তা—দুই পক্ষই বাজারব্যবস্থার অসঙ্গতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে ধান উৎপাদন থেকে শুরু করে হাটের ক্রয়মূল্য, মিল পর্যায়ের ধান-চাল রূপান্তর ব্যয়, পাইকারি বিক্রয়মূল্য এবং খুচরা বাজারের দাম—পুরো সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা প্রকাশের দাবি উঠেছে।
কৃষকদের ভাষ্য, এক মৌসুমে লোকসান হলেও তাঁরা পরের মৌসুমে আবার ঋণ করে চাষে নামেন। কিন্তু বছরের পর বছর উৎপাদন খরচ না উঠলে কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।
নওগাঁর কৃষকদের প্রশ্ন এখন একটাই—দেশের খাদ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে যে কৃষক মাঠে ঘাম ঝরাচ্ছেন, তাঁর উৎপাদন খরচটুকুও যদি না ওঠে, তাহলে আগামী দিনে ধান চাষে কৃষক টিকে থাকবেন কীভাবে?
বিকে/মান্নান

