Logo

সারাদেশ

মোরেলগঞ্জে ইউপি ভবনে হেলমেট পরে অফিস

Icon

মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২০:২৪

অ
মোরেলগঞ্জে ইউপি ভবনে   হেলমেট পরে অফিস


মাথায় হেলমেট। সামনে কম্পিউটার, টেবিলে সরকারি নথিপত্র। স্বাভাবিকভাবেই অফিসের কাজ করছেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। দেখলে মনে হতে পারে, কোনো নির্মাণকাজের তদারকি করছেন তিনি। কিন্তু না—এটি তাঁর নিয়মিত অফিসের দৃশ্য।

সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মাথায় হেলমেট পরেই অফিস করেন শেখ মোর্শেদুর রহমান (৪০)। তিনি বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার ১ নম্বর বড়বাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। শুধু তিনি নন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কর্মরত অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও অনেকটা বাধ্য হয়েই হেলমেট পরে কাজ করতে হয়।

কারণ, তাদের মাথার ওপরের ছাদ নিরাপদ নয়।

কখনো ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা, কখনো বিম থেকে খুলে পড়ছে ভবনের অংশবিশেষ। হঠাৎ কী ভেঙে কার মাথায় পড়ে—এই আতঙ্ক নিয়েই প্রতিদিন চলছে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম। গত ছয় মাসে অন্তত সাতজন সেবাগ্রহীতা আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা।

অর্ধশত বছরের পুরোনো ভবন স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় অর্ধশত বছর আগে তৎকালীন চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান ‘বুড়ো মুন্সি’ বড়বাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের এই ভবন নির্মাণ করেন। দীর্ঘ সময় পার হলেও ভবনটির যথাযথ সংস্কার হয়নি। বছরের পর বছর ধরে অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিতে এখন এটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ভবনের হলরুম, তথ্যসেবা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কক্ষে প্রতিদিন মানুষের উপস্থিতি থাকে। জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ, বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্রসহ নানা সরকারি সেবা নিতে আসেন ইউনিয়নের মানুষ। ফলে ভবনের ঝুঁকি শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সোমবার সকালে পরিষদে সেবা নিতে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসহাক শেখ, বয়োবৃদ্ধ ধীরেন্দ্রনাথ ঢালী ও মেরাজুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভবনটির এমন বেহাল দশা। কিন্তু এখনো স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। তারা জানান, প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে ইউনিয়ন পরিষদে মানুষের আসা-যাওয়া রয়েছে। কেউ জন্মনিবন্ধনের জন্য, কেউ নাগরিক সনদ নিতে, আবার কেউ বিভিন্ন সরকারি প্রত্যয়নপত্রের জন্য আসেন। কিন্তু ভবনের ছাদ ও পলেস্তারা খসে পড়ার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

পরিষদের গ্রাম পুলিশ মো. নুর নবী ও মিঠুন ঘরামী বলেন, ভবনের ওপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই পলেস্তারা বা ভবনের কোনো না কোনো অংশ ভেঙে পড়ে। পরে সেগুলো সরিয়ে পরিষ্কার করতে হয়। তাদের ভাষ্য, ভবনের অবস্থা দেখে অনেক মানুষ এখন পরিষদে আসতেও ভয় পান। কিন্তু জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় সেবা নিতে হলে তাঁদের আসতেই হয়।

বড়বাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মোর্শেদুর রহমান প্রায় এক বছর ধরে সেখানে কর্মরত। তিনি বলেন, পরিষদ ভবনের একটি কক্ষও ভালো অবস্থায় নেই।

মোর্শেদুর রহমান বলেন, ‘প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ সেবা নিতে আসেন। অনেকের মাথার ওপর ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। গত ছয় মাসে এখানে কমপক্ষে সাতজন সেবাগ্রহীতা আহত হয়েছেন। বর্তমানে হেলমেট মাথায় দিয়ে কাজ করছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি।’


একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন বক্তব্যে পরিষদ ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেখানে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিকে কর্মঘণ্টার পুরোটা সময় নিরাপত্তার জন্য হেলমেট ব্যবহার করতে হয়, সেখানে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। গ্রামের সাধারণ মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু—জীবনের নানা প্রয়োজনীয় কাজে এই প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হন। অথচ সেই পরিষদ ভবনই যদি মানুষের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তা শুধু একটি ভবনের দুরবস্থা নয়; এটি স্থানীয় সেবা ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা আক্তার এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার অবস্থায় ছিলেন না। তিনি জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সভায় থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তথ্য সংগ্রহের জন্য বড়বাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদে গেলে চেয়ারম্যান ও কোনো সদস্যকে সেখানে পাওয়া যায়নি।

তবে প্রশ্নটি রয়ে গেছে—একটি ইউনিয়ন পরিষদের ভবন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হলে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে নিরাপত্তার জন্য প্রতিদিন হেলমেট পরে অফিস করতে হয়?

বড়বাড়িয়ায় সেই প্রশ্নের উত্তর যেন ভবনের ছাদ থেকেই প্রতিদিন খসে পড়ছে—পলেস্তারা হয়ে।

বিকে/মান্নান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন