Logo

সারাদেশ

১৬ বছর পর বাড়ি ফিরলেন বাবা

Icon

বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৫, ২১:১৬

অ
১৬ বছর পর বাড়ি ফিরলেন বাবা

ছবি : বাংলাদেশের খবর

পিলখানা হত্যাকাণ্ডে দীর্ঘ ১৬ বছর কারাগারে থাকার পর বাড়ি ফিরেছেন পটুয়াখালী বাউফলের মুসা হাওলাদার। জামিনে মুক্তি পেয়েই ওইদিনই (২৩ জানুয়ারি) মায়ের কোলে ফিরেছেন সাবেক বিডিআর ল্যান্স নায়েক মুসা হাওলাদার।

মুসা হাওলাদার কনকদিয়া ইউনিয়নের উত্তর কনকদিয়া গ্রামের রহমান মাস্টার বাড়ির মফিজ উদ্দিন হাওলাদার ছেলে। পাঁচভাই ও তিনবোনের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর মুক্ত হয়ে ফিরে আসায় মুসার বাড়িতে আনন্দের জোয়ার বইছে। ৯৮ বছর বয়সী অসুস্থ বাবা ও ৮৫ বছর বয়সের মা তাকে পেয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছে। তাকে এক পলক দেখার জন্য দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসছে আত্মীয়স্বজনরা।

জানা যায়, অতিদরিদ্র ও সাধারণ পরিবারের সন্তান মুসা ১৯৮৮ সালে তৎকালীন বিডিআরে যোগ দেন। তাদের পরিবারে বদরুলই একমাত্র সরকারি চাকরিজীবী ছিল। চাকরি করে ভাই-বোনদের লেখাপড়া করিয়েছেন ও পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ২১ বছর চাকরির মাথায় পিলখানার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কারাবন্দি হন তিনি। বিদ্রোহী, সিভিল ও বিস্ফোরক আইনে মামলায় জেল খাটেন দীর্ঘ ১৬ বছর। মুসার স্ত্রী ও দুই ছেলে সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে মহিউদ্দিন (২০) ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি করেন। ছোট ছেলে মারুফ (১৭) একটি কামিল মাদরাসায় লেখাপড়া করছেন।

মুসা হাওলাদার বলেন, মিথ্যা মামলায় দীর্ঘ ১৬ বছর কারাগারে থাকার পরে পরিবারের কাছে ফেরার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। বাবা ও ছেলের সঙ্গে একসাথে নামাজ পড়তে পারায় আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম জিনিস হল আমার বাবা-মা। তারা দুজনেই বৃদ্ধ, প্রায় সময়ই অসুস্থ থাকেন। ঠিকঠাকভাবে হাঁটা-চলা করতে পারেন না।

তিনি আরও বলেন, আমি যখন কারাগারে যাই, তখন আমার বড় ছেলের বয়স তিন বছর ও ছোট ছেলের বয়স এক বছর। আমি প্রতিটি মুহূর্ত খুব কষ্টের মধ্যে ছিলাম। যখন ছেলেদের কথা মনে হত, নিজেকে সামলাতে পারতাম না। আমার ভাইরা তাদের পরিচর্যা করায় আল্লাহ এ অবস্থানে নিয়ে আসছে। আমার কোনো সম্পদ নেই। আমি আমার ভাইদের পিছনে শ্রম দিয়েছি। তারা আমার সন্তানদের মানুষ করেছে। আমি ভাইদের প্রতি কৃতজ্ঞ।

মুসা হাওলাদার বলেন, আমার নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই যে নিজে চলতে পারব। পিলখানা ট্র্যাজেডির ঘটনা এ সরকার জানে, দেশবাসী ও বিশ্ব জানে কীভাবে এ ঘটনা ঘটেছে। আমার উপর অন্যায়ভাবে এ দোষ চাপানো হয়েছিল। ঘটনার দিন আমার ডিউটি ছিল না। আমি আশা করি, আমার হক আমি ফিরে পাব।

ছাত্রসমাজের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মুসা বলেন, ছাত্রসমাজ যদি এগিয়ে না আসতো তাহলে আমরা কারামুক্ত হতে পারতাম না। আমাকে অন্যায়ভাবে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছিল। জীবন থেকে ১৬টি বছর অন্যায়ভাবে কেড়ে নিয়েছে। বাবা-মায়ের খেদমত করতে পারিনি। স্ত্রী-সন্তানদের পাশে থাকতে পারিনি। জেলখানায় এখনো নির্দোষ বিডিআরের সদস্য রয়েছে। আমি তাদের মুক্তির দাবি জানাই।

মুসার ছোট ছেলে মারুফ বলেন, জন্মের পর থেকে বাবাকে কাছে পাইনি। বাবার আদর-ভালবাসা থেকে বঞ্চিত ছিলাম। এ প্রথম বাবার কাছে থাকার সুযোগ হয়েছে। স্কুলে যখন সহপাঠীদের বাবা যেত, তখন বাবা না থাকার অভাব বুঝেছি। বাবা এখন আমার কাছে ফিরে এসেছে, এটাই বড় পাওয়া। একসাথে বাবার সঙ্গে নামাজ আদায় করছি। আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া।

মুসার ছোট ভাই বশির উদ্দিন হাওলাদার বলেন, আমার ভাইয়ের উপর জুলুম হয়েছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ষড়যন্ত্রের শিকার আমার ভাই। এলাকায় মানুষের কাছ থেকে অনেক কথা শুনেছি। লোকজন বলেছে- অনেক বড় ধরনের অন্যায় করেছে, এজন্য এখনো ছাড়া পায়নি। আমরা একটা মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে ছিলাম, তা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আমার ভাই ফিরে আসায় আমরা অনেক খুশি।

আরিফুল ইসলাম সাগর/এমবি  

Logo
সম্পাদক ও প্রকাশক মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন