Logo

সারাদেশ

চাঁদপুরে উর্বর মাটি কাটায় উৎপাদন ক্ষমতা হারাচ্ছে জমি

আবাদি জমি কমছে

Icon

চাঁদপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৫, ২২:৩১

অ
চাঁদপুরে উর্বর মাটি কাটায় উৎপাদন ক্ষমতা হারাচ্ছে জমি

নদী বেষ্টিত জেলা চাঁদপুরের অধিকাংশ মানুষই কৃষি ও মৎস্য আহরণের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু অবৈধভাবে ভরাট ও অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা নির্মাণ করায় কমে যাচ্ছে এসব কৃষি জমি। এর ওপর অধিকাংশ বসতি পাকা ভবন নির্মাণ হওয়ার কারণে বেড়েছে ইটের চাহিদা। যার ফলে বছরের এই সময়টাতে ইটভাটায় ব্যবহারের জন্য অবাধে কাটা হচ্ছে ফসলি জমির উপরি অংশের উর্বর মাটি। এতে খাদ্য উৎপাদন হুমকি এবং জমির উর্বরতা হারাচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। এদিকে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এসব বন্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে দাবি প্রশাসনের।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার ৮ উপজেলায় ৯৮ হাজার ২৬৩ হেক্টর জমিতে কম-বেশি ধানসহ বিভিন্ন ফসলাদির উৎপাদন হয়। তবে এসব ফসলি জমিতেই গড়ে উঠেছে শতাধিক ইটভাটা। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্যমতে প্রায় অর্ধশত ইটভাটা অবৈধ। আর বৈধ এবং অবৈধ মিলিয়ে সবগুলোতেই ইট তৈরির জন্য কাটা হচ্ছে কৃষি জমির মাটির ওপরের স্তর।

সরেজমিন জেলার ফরিদগঞ্জ, হাজীগঞ্জ ও শাহরাস্তি উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে বিগত সময়ে অনুর্বর ও অনাবাদি জমির মাটি কেটে ইটভাটায় ব্যবহার হলেও এখন গোপনে এবং প্রকাশ্যে কৃষি জমির মাটি কাটা হচ্ছে। এসব উপজেলায় মাটি কাটার কাজে জড়িয়ে পড়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। তারাই বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে ভাটা মালিকদের যোগসাজশে ফসলি জমির উপরি অংশেরর উর্বর মাটি উজার করছে।

শাহরাস্তি উপজেলার চিকুটিয়া ব্রিজ সংলগ্ন ফসলি মাঠের সেচ ম্যানেজার মো. আকবর জানান, তাদের মাঠের কিছু জমি উঁচু-নিচু আছে। সে কারণে গত দুই বছর ফসলি জমির মাটি কাটা হচ্ছে। জমির উপরি অংশের মাটি কাটা অবৈধ জেনে কেন কাটা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভাটা মালিকদের সাথে চুক্তি এবং এই কাজে বিনিয়োগ হওয়ার কারণে মাটি কাটা হচ্ছে। তবে আগামী বছর থেকে আর কাটবেন না বলে তিনি জানান।

ফরিদগঞ্জ উপজেলার বালিথুবা পশ্চিম ইউনিয়নের মানিকরাজ এলাকার মেসার্স মানিক রাজ ব্রিক্স এর পরিচালক মিরন খান বলেন, ফসলি জমির মাটি কেটে ইট তৈরির কাজে লাগানোর বৈধতা নেই জানি। কিন্তু ইট তৈরির জন্য মাটি পাব কোথায়।  যে কারণে বাধ্য হয়ে মাটি কাটা হচ্ছে।

এসব এলাকার কৃষকরা বলছেন, আবাধি কৃষি জমির মাটি কাটায় জমির উর্বরতা যেমন হারাচ্ছে, তেমনি খাদ্য উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে। মাটি ইটভাটায় নিতে পরিবহনের জন্য রাস্তা তৈরি করতে গিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে আরো কৃষি জমি। একই সাথে অনেকে এসব জমির মাটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাছ থেকে ক্রয় করে জমি ভরাট করে বসত বাড়ি তৈরি করছে।

এদিকে সদর উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের মনিহার গ্রামের হাজী সাহেবের বাড়ির সামনে ওই বাড়ির হাবিবুর রহমান ও তার ছোট ভাই মিলন প্রায় ১০ একর জমির মাটি কেটে তৈরি করছেন দীঘি। এসব মাটি দীঘির চার পাশের বাঁধ এবং অন্য জমি ভরাট করে বসতির জন্য তৈরি করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের অনুমতি না নিয়ে পার্শ্ববর্তী জমির মালিকদের ক্ষতির সম্মুখীন করা হচ্ছে বলে ওইসব জমির মালিকদের মধ্যে আনোয়ার উল্যাহ, আবিদ আলি ও মো. শাহাজালাল ইতোমধ্যে প্রশাসনের নিকট অভিযোগ দিয়েছেন।

অভিযুক্ত হাবিবুর রহমান বলেন, এখানে মাদ্রাসা হবে এবং মসজিদ পরিচালনার জন্য এই দীঘি কাটা হচ্ছে। আমরা মনে করি কারো ফসলের ক্ষতি হবে না। তবে আমাদের জমি শ্রেণি যেহেতু নাল, এটি দীঘি করার পূর্বে প্রশাসনের অনুমোদন নেওয়া প্রয়োজন ছিল।

চাঁদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, অপরিকল্পিতভাবে কৃষি জমির উর্বর মাটি কেটে নেয়ার ফলে এটি পূর্বের অবস্থায় এবং উৎপাদনযোগ্য হতে সময় লাগে প্রায় ১৫-২০ বছর। কিন্তু এই সময়েও আবাদের জন্য এসব জমি পূর্বে কাছাকাছি যেতে পারে, কিন্তু আগের মত উর্বরতা থাকে না। জমির ওপরের ৬ ইঞ্চির মধ্যেই থাকে বেশি উর্বরতা। কাটা হচ্ছে  আরো অনেক বেশি। কৃষি জমিগুলো রক্ষায় আমাদেরকে মাটি কাটার জন্য যে আইন রয়েছে, তা বাস্তবায়নে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইয়াসির আরাফাত বলেন, কৃষি জমির উপরি অংশের মাটি কাটা হচ্ছে এমন তথ্য আসলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে প্রশাসনিক নানা কাজের মধ্যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং অভিযান অব্যাহত থাকবে।

চাঁদপুর সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আল-ইমরান খাঁন বলেন, জমি ভরাট করা যাবে আবার প্রয়োজনে পুকুর কিংবা দীঘিও করা যাবে। তবে ওই ব্যক্তি তার জমির শ্রেণি পরিবর্তন করতে হলে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট (ডিসি) এর নিকট আবেদন করতে হবে। আবেদনের প্রেক্ষিতে তদন্ত হবে এবং তারপর ওই শ্রেণি পরিবর্তনের বিষয়টি জনহিতকর হলে আবেদন মঞ্জুর হবে। এই ধরনের শ্রেণি পরিবর্তনের জন্য একাধিকবার তদন্ত করারও প্রয়োজন হয়।

আলআমিন ভূঁইয়া/এমএইচএস

Logo
সম্পাদক ও প্রকাশক মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন