Logo

সারাদেশ

গ্রামটিতে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার ও হিজড়া-হকার প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা

Icon

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১০:৩৬

অ
গ্রামটিতে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার ও হিজড়া-হকার প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা

ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ফলসী ইউনিয়নের একটি গ্রাম শড়াতলা। এক সপ্তাহ ধরে গ্রামের দেয়ালে দেয়ালে একটি নোটিশ দেখা যাচ্ছে। এতে লেখা, শড়াতলা গ্রামে সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র ও হকার নিষিদ্ধ। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও গ্রামটিতে ঢুকতে পারবেন না। এই নিয়ম অমান্য করলে গুনতে হবে জরিমানা। ওই নোটিশে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদ-মাদ্রাসার সভাপতি, শিক্ষক, ইমাম ও সমাজসেবকসহ ১৯ জনের স্বাক্ষর রয়েছে। সমাজপতিদের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ জেলা-উপজেলার সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। তারা বলছেন, এটা বেআইনি। তবে এটিকে ‘সামাজিক অবক্ষয় রোধে ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ।

জানা যায়, ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলার শড়াতলা গ্রাম জেলা শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই গ্রামটি একসময় ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হরিণাকুণ্ডু ইউনিয়নের অন্তর্গত ছিল। ২০০২ সালে হরিণাকুণ্ডু পৌরসভা গঠিত হলে এটি ৬নং ফলসী ইউনিয়নে একীভূত হয়। এখনো এ গ্রামের মানুষের দিনের অধিকাংশ সময় কাটে শহরে। যার ফলে শিল্প, সাহিত্য, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি এবং ইতিহাস- ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে গ্রামটিতে। তবে সেখানকার সমাজপতিদের বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধের এমন সিদ্ধান্তে হতবাক হয়েছেন জেলা-উপজেলার সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষেরা। আবার এটিকে সামাজিক অবক্ষয়রোধে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দেয়ালে দেয়ালে সাঁটানো রয়েছে ১০০ টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প। তাতে বড় করে লেখা আছে- ‘সকল প্রকার বাদ্যযন্ত্র ও হকার নিষিদ্ধকরণের নোটিশ। গ্রামে সকল প্রকার বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ করা হলো। যারা এই নিয়ম ভঙ্গ করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। আইন ভঙ্গকারীর বাবা-মায়ের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেই সঙ্গে আরও জানানো হচ্ছে যে, সকল প্রকার হকার ও হিজড়াদের প্রবেশ এখানে নিষিদ্ধ করা হলো। যেহেতু আমাদের গ্রামে ৯৫ শতাংশ মানুষ শিক্ষিত ও ২০ জন সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী আছে। নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যত বিবেচনা করে গ্রামবাসী এই সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছে।’

নোটিশের শেষ অংশে গ্রামবাসীর পক্ষে ১৯ জন স্বাক্ষর করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি, শিক্ষক, ইমাম ও সমাজসেবক।

এদিকে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নানা রকমের আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সমাজপতিদের এমন সিদ্ধান্তে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। পাশাপাশি এ নিয়ম জারি করা ব্যক্তিদের সামাজিক রীতিবিরোধী আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। একজন নিজের ফেসবুক আইডিতে এ বিষয়ে পোস্ট করেন। সেখানে মন্তব্যের ঘরে একজন লিখেছেন, ‘প্রতিটি গ্রামে-শহরে মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা রয়েছে। গুটিকয়েক মানুষ আইনবহির্ভূত কাজ করবে, এটা হতে পারে না।’ আরেকজন মন্তব্য করেছেন, ‘হকার ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা আসুক, তবে বাদ্যযন্ত্র না বাজিয়ে তাদের কাজ সেরে চলে যাক।’

গ্রামের যুবক মেহেদী পারশি বলেন, গ্রামের মানুষ আমাদের যুবসমাজের ভালোর জন্য এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এটাকে অনেক বেশি রঞ্জিত করে প্রকাশ করেছে। যার কারণে বিষয়টি এখন বিতর্কিত হচ্ছে।

গ্রামের বাসিন্দা মশিয়ার হোসেন বলেন, গ্রামের যুবকেরা প্রতিদিন পিকনিক করতো এবং সেখানে উচ্চস্বরে গান বাজাতো। এতে করে প্রতিবেশীসহ বয়স্ক ও অসুস্থ রোগীরা আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। এ ছাড়া হিজড়ারা গ্রামে এসে জোরপূর্বক টাকা নিত। এসব কারণে সমাজের লোকজন মিলে নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যত বিবেচনা করেই এমন সিদ্ধান্ত। তবে এই বিষয় এখন বিতর্কিত।

নোটিশে সই করা শড়াতলা গ্রামের পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি এনামুল হক বলেন, গ্রামে উচ্চস্বরে বাদ্যযন্ত্র বাজানো হতো। এতে অসুস্থ মানুষ, শিক্ষার্থী, নারী ও শিশুসহ অনেকের সমস্যা হতো। এ ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বিভিন্ন সময়ে উচ্চস্বরে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নাচগান করে। এতে মানুষের সমস্যা হয়। তারা এবং হকাররা নানান সময়ে মানুষের কাছ থেকে অধিক টাকাপয়সা হাতিয়ে নেয়। তাই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। 

ফলসী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য তৌহিদুর রহমান বলেন, গ্রামে প্রতিনিয়ত বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে পিকনিক করতো। যার কারণে গ্রামে অসুস্থ রোগী, বয়স্কদের সমস্যা হতো। এ ছাড়া বাদ্যযন্ত্রের কারণে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ক্ষতি হয়। এজন্য গ্রামের ছেলেমেয়েদের সুবিধার জন্য গ্রামের দুটি মসজিদে মিটিং করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গ্রামের ভালোর জন্য করলেও বিষয়টি বিতর্কিত হয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে ফলসী ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম বলেন, আমি অসুস্থ। ঢাকায় চিকিৎসাধীন আছি। এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।

ঝিনাইদহের বিহঙ্গ সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক শাহীনূর আলম লিটন বলেন, নব্বইয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আমরা পথনাটক এবং গান-বাজনার মাধ্যমে মানুষকে সম্পৃক্ত করেছিলাম। চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনেও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষের ভূমিকা রয়েছে। আমি মনে করি, একটি গোষ্ঠী আমাদের সমাজকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্য ধর্মকে মানুষের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। অথচ সৌদি আরবসহ অনেক মুসলিম দেশেও সাংস্কৃতিক চর্চা হচ্ছে।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটা এলাকা থেকে কেউ বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ করতে পারে না। এটা বেআইনি। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের প্রতি দাবি জানাই।

হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বি.এম. তারিক-উজ-জামান বলেন, সড়াতলা গ্রামে যেটি ঘটেছে সম্পূর্ণভাবে আইনের পরিপন্থি। আমার ইতোমধ্যে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছি জড়িতদের চিহ্নিত করতে এবং গ্রামে বাড়ির দেয়াল থেকে পোস্টারগুলো সরিয়ে ফেলতে। তারা সেগুলো সরিয়ে ফেলেছে। তবে যে স্ট্যাম্পটি ফটোকপি করে দেয়ালে মারা হয়েছে সেখানে ইউএনওর নাম্বার থাকলেও, মূল স্ট্যাম্পে কোনো নাম্বার দেওয়া নেই। হয়তো আমাদেরকে বিতর্কিত করতেই নাম্বার দিয়ে পোস্টারিং করা হয়েছে। 

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আমি এর সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছি। এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এম বুরহান উদ্দীন/বিএইচ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন