Logo

অপরাধ

শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন হত্যায় সর্বশেষ যা জানা গেল

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:১৯

শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন হত্যায় সর্বশেষ যা জানা গেল

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যার ঘটনায় কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। 

তবে ঢাকার অপরাধজগতের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলেই ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 

সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন ঢাকার ‘সিটি অব গড’খ্যাত মোহাম্মদপুর অঞ্চলের দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল ও সানজিদুল ইসলাম ইমন। 

ভুক্তভোগী টিটনসহ সন্দেহভাজন দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী নব্বইয়ের দশকে ঢাকার মোহাম্মদপুর অঞ্চলে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছিলেন। এর মধ্যে ইমন হলেন টিটনের ভগ্নিপতি।

পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, সন্দেহের তালিকায় থাকা দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গেই বিরোধ ছিল নাঈম আহমেদ টিটনের। ইমনের সঙ্গে অস্ত্রের ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। সম্প্রতি ঢাকার মোহাম্মদপুরের বছিলায় কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে পিচ্চি হেলালের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয় টিটনের। ফলে এই দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর কোনো একটি পক্ষ নাঈম আহমেদ টিটনকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।

তবে টিটনের ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বুধবার ঢাকার নিউমার্কেট থানায় করা মামলায় কাউকে আসামি করেননি। যদিও সন্দেহভাজন হিসেবে পিচ্চি হেলাল ও তার তিন সহযোগী বাদল ওরফে কিলার বাদল, শাহজাহান, রনি ওরফে ড্যাগারি রনির নাম উল্লেখ করা হয়েছে এজাহারে। তাদের সঙ্গে বছিলায় কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে টিটনের বিরোধ চলছিল বলে বাদী জানিয়েছেন।

মামলার বাদী সাঈদ বলেন, মৃত্যুর তিন দিন আগে আমার সঙ্গে টিটনের সর্বশেষ কথা হয়েছিল। টিটন জানিয়েছিল, বছিলার গরুর হাটের ইজারা নিয়ে পিচ্চি হেলালের সঙ্গে বিরোধ চলছিল। তবে পিচ্চি হেলালের সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়েছে। তারা একসঙ্গে কাজ করবেন। তার ধারণা, টিটন হত্যার নেপথ্যে রয়েছেন পিচ্চি হেলাল। বিষয়টি তিনি মামলার এজাহারে উল্লেখ করেছেন।

ইমনের সঙ্গে টিটনের কোনো বিরোধ ছিল না উল্লেখ করে সাঈদ আক্তার রিপন বলেন, ইমনের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। ইমনের সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই। 

মোহাম্মদপুর অঞ্চলের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ জোসেফের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যার আসামি টিটন। এ জন্য সাঈদ আক্তার রিপন জোসেফকে সন্দেহ করছেন। তিনি বলেন, কে বা কারা, কেন টিটনকে হত্যা করেছেন, সেটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খুঁজে বের করবে।

গত মঙ্গলবার রাত পৌনে আটটার দিকে রাজধানীর নিউমার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে টিটনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২০০১ সালে সরকারঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকার দুই নম্বরে ছিল তার নাম। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান তিনি।

তদন্ত–সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, টিটনকে গুলি করেছেন একজন এবং আরেকজন সহযোগী ছিলেন। তারা একটি মোটরসাইকেল করে ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। দুজনের মুখেই মাস্ক ছিল। যিনি গুলি করেছেন, তার মাথায় ক্যাপ ছিল এবং পরনে সাদা শার্ট ছিল। গুলি করার পর তারা মোটরসাইকেলে করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। টিটনের কপাল, মাথা, ঘাড়সহ শরীরে ছয়টি গুলি করা হয়।

টিটন হত্যা মামলার তদন্ত করছে নিউমার্কেট থানা-পুলিশ। পুলিশের নিউমার্কেট অঞ্চলের সহকারী কমিশনার মো. নাসিম-এ গুলশান বলেন, এ হত্যার সঙ্গে কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি। তবে প্রযুক্তিগত তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

টিটন হত্যার পর আবারও আলোচনায় এসেছে ঢাকার মোহাম্মদপুর। হত্যায় যাদের নাম এসেছে, তারা নব্বইয়ের দশকে মোহাম্মদপুরে বেড়ে উঠেছিলেন। 

মামলার নথি, পুরোনো পত্রিকা ও পুলিশের প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, টিটন হত্যায় নাম আসা ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমন ও তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফ নব্বইয়ের দশকে একই অপরাধী দলে যুক্ত ছিলেন। এই অপরাধী দলের নিয়ন্ত্রক ছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ছোট ভাই জোসেফ। খুনের শিকার টিটনও এই বাহিনীর সদস্য ছিলেন।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে ইমন ও পিচ্চি হেলাল আলাদা সন্ত্রাসী দল গঠন করেন। ১৯৯৭ সালে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন জোসেফ। তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়ে মুক্তি পান। তিনি কারাগারে থাকা অবস্থাতেই ১৯৯৯ সালের ১৩ মার্চ ইমন বাহিনীর হাতে খুন হন জোসেফের ভাই আবু সাঈদ টিপু ও তার বন্ধু এমরান। ইমন ও টিটন এ হত্যা মামলার আসামি।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০১ সালে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে পুলিশ। ওই তালিকায় মোহাম্মদপুরের ইমন, টিটন, পিচ্চি হেলাল ও হারিস আহমেদের (সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ ও জোসেফের ভাই) নাম ছিল। হারিস আহমেদ ছাড়া অন্যরা গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের ১০ দিনের মধ্যেই ইমন, হেলাল ও টিটন কারাগার থেকে মুক্ত হন। তারপর এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। তাদের মধ্যে ইমন বিদেশে পালিয়ে গেলেও পিচ্চি হেলাল ও টিটন দেশেই অবস্থান করেন। তবে তাদের বিরোধ চরম আকার ধারণ করে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, মোহাম্মদপুর ও আশপাশ এলাকার অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ এবং স্বার্থকেন্দ্রিক বিরোধ থেকে টিটন খুনের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন