এলজিইডি প্রধান প্রকৌশলীর ক্যাশিয়ারের ভূমিকায় ড্রাইভার রফিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ১৮:৫৫
ছবি: সংগৃহীত
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডিতে আউটসোর্সিংয়ে নিযুক্ত একজন ড্রাইভারের মাসিক বেতন ১৭ হাজার। এর বাইরে নেই বৈধ উপায়ে আর কোনো আয়। চড়া মূল্যস্ফীতির এই সময়ে যখন স্বল্প আয়ের মানুষের সংসার চালানোই কষ্ট, তখন এলজিইডির একজন ড্রাইভারের জীবনযাপন অনেকটাই বিলাসী টাইপের।
রাজধানী শহরে তার বাড়ি তিনটি, রয়েছে ব্যক্তিগত দুটি গাড়ি, এমনটিই জানান সংশ্লিষ্টরা। এসব গাড়ি ভাড়া দিয়েছেন তার চাকরিস্থল স্বয়ং এলজিইডিতেই, এমন অভিযোগও রয়েছে। নামমাত্র চাকরি করে এমন আয়েশী জীবনযাপন করেন স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর- এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর গাড়ী চালক রফিকুল ইমলাম।
তার দুর্নীতির উৎস উপজেলা প্রকৌশলী, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীসহ কর্মচারীদের বদলীর তদবীর করা এবং প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও নির্বাহী প্রকৌশলীদের কাছ থেকে রুটিন মাফিক চাঁদা আদায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের গাড়ি চালক। বেলাল হোসেন যখন দুবার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) ছিলেন, সেই সময় থেকেই নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য করেন রফিকুল। তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে যান বেলাল হোসেন প্রধান প্রকৌশলী হলে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলজিইডির একজন ড্রাইভার জানান, স্ট্যান্ডবাই গাড়ি চালকদের ডিউটি বণ্টন হয় তার নির্দেশে। তাকে ঘুষ দিলে ভালো ডিউটি মেলে, না হলে নাম ওঠে না ডিউটি রোস্টারে। অভিযোগ রয়েছে, আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত এই ড্রাইভার রফিক সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী উপজেলা প্রকৌশলীদের বদলি করছেন অহরহ। সূত্র আরও জানায়, প্রায় একমাস আছে নারায়ণগঞ্জ জেলার রুপগঞ্জ উপজেলার উপজেলা প্রকৌশলীর পোস্টিং দেন এই রফিক। এ বাবদ ঘুষ নেয় আট লাখ টাকা। এলজিআরডি মন্ত্রী ওই আদেশ বাতিলের কথা বললেও প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন তা করেননি।
অলিখিত ক্যাশিয়ার: সম্প্রতি এলজিইডিতে বিভিন্ন জেলায় নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদায়ন করা হয় প্রায় অর্ধশত। গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে নিয়োগ দেওয়া হয় পরিচালক (পিডি)। এসব ক্ষেত্রে লেনদেনে ব্যাপক বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে। কৌশল হিসেবে, বিভিন্ন মন্ত্রী ও এমপির ডিও লেটার সামনে রেখে পদায়ন করেন বেলাল হোসেন। আর ব্যাকগ্রাউন্ডে চলে লেনদেন। ২৩ লাখ টাকা থেকে শুরু করে জেলাভেদে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে সাম্প্রতিক নিয়োগে।
আর এসব টাকার বড় অংশই সংগ্রহ করেন ড্রাইভার রফিকুল। এ ছাড়া, আউটসোর্সিং নিয়োগ, উপজেলা প্রকৌশলী, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীদের বদলির বিষয় রফিকের সুপারিশই বাস্তবায়ন করেন প্রধান প্রকৌশলী। তার সঙ্গে লেনদেনের বোঝাপড়া হলেই বদলির আদেশ হয়ে যায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। এ ছাড়া, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, জন্মদিনসহ বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষ্যে গিফটের নামে জেলার এক্সেন, পিডি, উপজেলা প্রকৌশলীদের কাছ থেকে আদায় করে নেন মোটা অঙ্কের অর্থ। সংস্থার মধ্যে আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ড্রাইভার রফিকুল।
রফিকুলের যত সম্পদ: গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর হলেও এখন গাজিপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন প্রধান প্রকৌশলীর গাড়িচালক রফিকুল ইসলাম। অবৈধ আয়ের টাকায় গাজিপুরে তিনটি বাড়ি করেছেন, এমন অভিযোগ মিলেছে। যার একটি দশকাঠা জমির উপর। গাজীপুর সাফারি পার্কের নিকট রয়েছে ছয় তলা বাড়ি। তার পরিবার ওই বাড়িতেই বসবাস করে। তিনি নিজে দুটি গাড়ি কিনেছে, যা এলজিইডি’র অফিসে ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। গাড়ি ভাড়া থেকে মাসে আয় ৪০ হাজার টাকা। সূত্র আরও জানায়, রফিক সপ্তাহে ঘুষ বাবদ যা কামায় সপ্তাহ শেষে বৃহস্পতিবার রাতে গাজীপুর যায় এবং সেখানে রেখে আসেন। গাজীপুর চৌরাস্তায় আরও একটি টিনসেড বাড়ি আছে সেখান থেকে প্রতিমাসে ভাড়া আসে ৪০ হাজার টাকা।
এইসব অনিয়ম দুর্নীতি ও বদলি বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনকে ফোন দিলে তিনি তা রিসিভ করেননি। তবে ড্রাইভার রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা ছড়ানো হচ্ছে। আমি পরিশ্রম করে উপার্জন করি। অবৈধ আয় ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

