Logo

অর্থনীতি

বাজেট

পরিবর্তন আসছে ১১ খাতে

মো. বাবুল আক্তার

মো. বাবুল আক্তার

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৫, ০৭:৪৭

পরিবর্তন আসছে ১১ খাতে

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণসহ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে, বড় রকমের শুল্ক ও কর সংস্কার আসছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে। ১১ খাতে পরিবর্তনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাজেটে এ সংস্কার করতে যাচ্ছে।

আগামীকাল সোমবার বিকেল ৪টায় অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাজেট ঘোষণা করবেন। তবে এবার সংসদ না থাকায় বাজেট সংসদে উপস্থাপন হচ্ছে না। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে এবং বেসরকারি চ্যানেলগুলোতেও একযোগে বাজেট বক্তব্য সম্প্রচার হবে।

এর আগে সংসদের বাইরে বাজেট দেওয়া হয়েছিল ২০০৮ সালে। তখন ক্ষমতায় ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ওই বছরের ৯ জুন তখনকার অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম ২০০৮-০৯ অর্থবছরের জন্য ৯৯ হাজার ৯৬২ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছিলেন। সেদিনও ছিল সোমবার। দুপুর ৩টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে সম্প্রচার করা হয়েছিল মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের বাজেট বক্তব্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি বছরের তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কম। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো বাজেটের আকার কমছে। মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্ব এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

নতুন বাজেটে ৬২২টি পণ্যে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার বা হ্রাস এবং ১০০টি পণ্যে কাস্টম ডিউটি কমানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। উপকৃত পণ্যের তালিকায় রয়েছে কোল্ড স্টোরেজ যন্ত্রপাতি, পেপার পণ্য, বাস, নিউজপ্রিন্ট, ক্যান্সার চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ওষুধ ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের কাঁচামাল। এছাড়া তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর শুল্ক অব্যাহতির প্রস্তাবও থাকছে। আমদানি ঘোষণায় ভুল থাকলে বর্তমানে ৪০০ শতাংশ শাস্তির পরিবর্তে তা কমিয়ে ২০০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে ব্যবসায়িক পরিবেশ আরও সহনশীল হয়।

এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের পরিপ্রেক্ষিতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে, এনবিআর ১০০টি পণ্যে শূন্য শুল্কের প্রস্তাব আনছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে টেক্সটাইল খাতের কাঁচামাল, শিল্প যন্ত্রপাতি এবং সামরিক সরঞ্জাম।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাজেটে ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগের ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত ৭৯টি নতুন কাঁচামালকে শুল্কমুক্ত তালিকায় আনা হচ্ছে। এতে দেশে চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস এবং স্বাস্থ্যসেবার গুণগতমান উন্নত হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। কৃষিপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে কোল্ড স্টোরেজ যন্ত্রপাতির (বিশেষ করে কম্প্রেসর) ওপর শুল্ক ছাড় দেওয়া হচ্ছে। খেলনা ও ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কাঁচামালে শুল্ক কমানোর পাশাপাশি প্রস্তুত খেলনার আমদানি শুল্কমূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে প্রতি কেজি চার ডলার। উইলো কাঠের (ক্রিকেট ব্যাট তৈরির জন্য জনপ্রিয় কাঠ) শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৬ শতাংশ করার প্রস্তাবও থাকছে।

ঢাকার যানজট নিরসনে ১৬ থেকে ৪০ আসনের বাস আমদানিতে শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হচ্ছে। মাইক্রোবাসে (১০-১৫ আসন) সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিশোধিত চিনির ওপর নির্দিষ্ট শুল্ক ৪ হাজার ৫০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৪ হাজার টাকা প্রতি টন করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বাজারে দামের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে।

দেশীয় সফটওয়্যার রপ্তানিতে উৎসাহ দিতে সফটওয়্যার উন্নয়ন সরঞ্জাম, অপারেটিং সিস্টেম, ডেটাবেস এবং সিকিউরিটি সফটওয়্যারের আমদানিতে শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব আনা হচ্ছে। অপরিহার্য খাতে শুল্ক ছাড়ের পাশাপাশি বিলাস পণ্যে শুল্ক মূল্যবৃদ্ধি করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, লিপস্টিক ও ফেসওয়াশের ন্যূনতম শুল্ক মূল্য দ্বিগুণ করে প্রতি কেজি ৪০ ডলার করা হচ্ছে। চকোলেটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের মূল্যবৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যবসা ও জরুরি সেবায় ব্যবহৃত হেলিকপ্টার আমদানিতে শুল্ক ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাজেটে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন ব্যয় হ্রাসে এলএনজি আমদানিতে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) মওকুফ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রাজস্ব আয় বাড়াতে আসন্ন বাজেটে আয়কর কাঠামোয় একাধিক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য পুনরায় ৩০ শতাংশ করহার চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি আয়ের বিভিন্ন স্তর অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন করহার নির্ধারণ করে ধাপে ধাপে বাড়তে থাকা হারে (গ্র্যাজুয়েটেড) কর কাঠামো চালুর চিন্তাভাবনাও রয়েছে। ফলে স্বল্প আয়ের করদাতাদের তুলনায় উচ্চ আয়ের করদাতাদের ওপর করের চাপ বেশি পড়বে।  

এই বাজেটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করা। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ, শিল্পোন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

জুলাই অভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ভিন্ন বাস্তবতায়, এবার সংসদের বাইরে বাজেট উপস্থাপন করা হবে ভিন্ন আঙ্গিকে। সংসদ না থাকায় সংসদের আলোচনা বা বিতর্কের কোনো সুযোগ থাকছে না। তবে বাজেট ঘোষণার পর প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর নাগরিকদের কাছে মতামত চাইবে অর্থ মন্ত্রণালয়। মতামতের ভিত্তিতে তা চূড়ান্ত করা হবে। এরপর আগামী ২৩ জুনের পর যে কোনো একদিন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদন নিয়ে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ আকারে তা আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর করা হবে।

বিকেপি/ওএফ

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

জাতীয় বাজেট ২০২৫-২৬

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর