দেশে খেলাপি ঋণ বেড়ে ২০.২৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৫, ১৮:১৪
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশ এখন এশিয়ার সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের দেশে পরিণত হয়েছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) সদ্য প্রকাশিত ‘ননপারফর্মিং লোনস ওয়ার্চ ইন এশিয়া ২০২৫’ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৪ সালে দেশে খেলাপি ঋণ (এনপিএল) বেড়ে মোট ঋণের ২০.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২০.২৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি।
এডিবির প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে এশিয়ার ‘সবচেয়ে ভঙ্গুর ব্যাংকিং ব্যবস্থা’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০২৩ সালে যেখানে খেলাপি ঋণ ছিল ১৫.৮ বিলিয়ন ডলার এবং অনুপাত ছিল ৯ শতাংশ, এক বছরের ব্যবধানে তা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। গত পাঁচ বছরে এ হার ২০২০ সালের ৭.৭ শতাংশ থেকে ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে ২০২৪ সালে ২০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
অন্যদিকে, প্রতিবেশী দেশগুলো গত বছর খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ভারতের এনপিএল হার ৩.৪ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ২.৫ শতাংশে, দুর্দশাগ্রস্ত অর্থনীতির দেশ পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাতেও হার কমেছে। তবে জেনজিদের আন্দোলনে প্রভাবে নেপালে সামান্য বৃদ্ধি হয়েছে (০.৯ শতাংশ পয়েন্ট)। ফলে বাংলাদেশকে প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যতিক্রমী দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিনের শিথিল নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আগের সরকারের সময় ঋণ শ্রেণিকরণে শিথিলতা এই সংকট তৈরি মূল নেয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আগের সরকার বড় গ্রুপগুলোর ঋণ বারবার পুনঃতফসিল করেছে, ফলে প্রকৃত খেলাপির পরিমাণ আড়ালে ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকও আসল চিত্র প্রকাশ করেনি। নতুন নেতৃত্ব আসার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন প্রকৃত পরিসংখ্যান প্রকাশ শুরু করেছে, ফলে খেলাপির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।’
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘ভারত কঠোর সংস্কারের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে এনেছে। বাংলাদেশেও সংস্কার শুরু হলেও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কাঠামো তৈরি না হলে টেকসই সমাধান আসবে না।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অনেক গ্রুপের ঋণ এখনো সম্পূর্ণভাবে খেলাপি হিসেবে স্বীকৃত হয়নি।’
এডিবি ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ‘কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কার যথেষ্ট নয়—শক্তিশালী আইন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা—এসব নিশ্চিত করা জরুরি।’
এডিবি আরও সতর্ক করেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা, বাণিজ্যিক বিরোধ এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন করে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ জন্য তারা সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রক কাঠামো, কার্যকর ঋণ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া, বাজার স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো খেলাপি ঋণ কমাতে সক্ষম হয়েছে সেখানে বাংলাদেশে খেলাপি বেড়েছেই চলেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর প্রায় ৯০ শতাংশ খেলাপি ঋণ থাকায় দেশের ৫টি শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকে একীভূত করার প্রাথমিক উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগ তখনই সফলতার মুখ দেখবে যখন ব্যাংকগুলো থেকে খেলাপি ঋণ কমবে। নামমাত্র একীভূতকরণ করা হলে ব্যাংক খাত আরও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।’
এএইচএস/এএ

