৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা–ওয়াশিংটনের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি : বাণিজ্য সচিব
বাংলাদেশের প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১:৩১
ফাইল ছবি
আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা (রেসিপ্রোকাল) শুল্কহার নিয়ে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির একটি সম্ভাব্য তারিখ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান।
রোববার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে একটি খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করা হয়েছে এবং নির্ধারিত তারিখে স্বাক্ষরের অনুমোদন চেয়ে একটি সামারি পাঠানো হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরে নেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ এবং পরে ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক ঘোষণা করেন। পরে আলোচনার সুযোগ রেখে ওয়াশিংটনে তৃতীয় দফার আলোচনা শেষে গত ৩১ জুলাই শুল্কহার কমিয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়াসহ বাংলাদেশকে বেশ কিছু ছাড় দিতে হয়।
শুল্কহার কত শতাংশ হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য সচিব বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের রেসিপ্রোকাল শুল্কহার ২০ শতাংশ রয়েছে। অনেক দেশের ক্ষেত্রেও একই হার কার্যকর আছে, আবার কিছু দেশের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি। তবে আমাদের আশা আছে, এই হার কিছুটা কমতেও পারে। সে ধরনের একটি ধারণা রয়েছে, যদিও এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। খসড়া তৈরি হয়েছে, তবে শুল্ক কত হবে, তা নির্ধারণে ৯ ফেব্রুয়ারির আগ পর্যন্ত সময় নেওয়া হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই সুবিধা পেতে বাংলাদেশকেও বেশ কিছু ছাড় দিতে হচ্ছে।
গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্কহার কমিয়ে ২০ শতাংশ কার্যকর করলেও দেশটির সঙ্গে কোনো চুক্তি হয়নি। পরে এই শুল্ক আরও কমানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা দিয়ে উৎপাদিত পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায়ের বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখে ঢাকা, যা এখন চূড়ান্ত হয়ে চুক্তিতে রূপ নিতে যাচ্ছে।
সম্প্রতি ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর করেছে। এ নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য সচিব বলেন, এখানে উদ্বেগের কিছু নেই। তৈরি পোশাক খাতে আমরা গত ৪৫ বছরে সক্ষমতা অর্জন করেছি। বর্তমানে আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ এবং এ খাতে আমাদের অবকাঠামোও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম। এই সক্ষমতা কেউ রাতারাতি অর্জন করতে পারবে—এমনটা আমাদের মনে হয় না।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর অনেক সুযোগ–সুবিধা হারাতে হবে এবং নতুন করে শুল্ক যুক্ত হবে—এ প্রসঙ্গে সরকার নতুন করে এফটিএ ভাবছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমরা একাধিক দেশের সঙ্গে এফটিএ করছি। জাপানের সঙ্গে এফটিএর পুরো আলোচনা শেষ হয়েছে এবং আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি দেশটির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হবে।
তিনি আরও বলেন, গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, চলতি বছরের মধ্যেই তাদের সঙ্গেও এফটিএ স্বাক্ষর হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছেও এফটিএর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে যেসব বাজারে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে, সেসব দেশকেও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত আলোচনায় বসা হবে।
রমজানের প্রস্তুতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য সচিব বলেন, রমজান মাসে নিত্যপণ্য ও মৌসুমি পণ্যের বাজার পরিস্থিতি এবং সরবরাহ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ বছর পরিস্থিতি ভালো রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিমানের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা আগেই ছিল। এই চুক্তির বাইরেও বোয়িংসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে কোন বছর উড়োজাহাজ সরবরাহ করা যাবে, দাম কত হবে এবং কনফিগারেশন কেমন হবে—এসব বিষয়ে নেগোসিয়েশন চলছে।
এ চুক্তির আওতায় যুদ্ধবিমান কেনা হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য সচিব বলেন, যুদ্ধবিমান কখনোই এই চুক্তির আওতায় আসবে না। সামরিক বিষয় কখনো বাণিজ্য আলোচনার অংশ নয়।
গত ছয় মাসে রপ্তানি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে—যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল—এ বিষয়ে পরিকল্পনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশ্ববাণিজ্যেই এ সময়ে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। আমরা এর বাইরে নই। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ, ৩ শতাংশ নয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা দিয়ে উৎপাদিত পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা চেয়ে আসছে বাংলাদেশ। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়ানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা দিয়ে তৈরি পোশাক শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলে তা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হবে। এতে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা রপ্তানি বাড়বে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিও বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরে এ অঙ্ক ছিল ২৭৮ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার এখনো যুক্তরাষ্ট্র।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেড় বিলিয়ন ডলার আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এতে স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় হতে পারে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
এ ছাড়া পাঁচ বছর মেয়াদে প্রতিবছর সাত লাখ টন করে গম আমদানি, সামরিক পণ্য ও বেসামরিক উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ আমদানি বৃদ্ধি, জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল, গম ও তুলা আমদানি বাড়ানো এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পরিকল্পনাও রয়েছে।
এএস/

