Logo

অর্থনীতি

লাল ফিতায় আটকা শেয়ারবাজার সংস্কার

Icon

এম এম হাসান

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৮

লাল ফিতায় আটকা শেয়ারবাজার সংস্কার

গ্রাফিক্স : বাংলাদেশের খবর

প্রায় দুই দশক ধরে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করছেন মাসুদুর রহমান। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ায় তিনি আশাবাদী হয়েছিলেন। তবে এই উদ্যোগ গ্রহণের দীর্ঘ ৯ মাস পার হলেও একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানও বাজারে আসেনি। এতে হতাশ হয়েছেন তিনি। বিরক্তির কণ্ঠে মাসুদুর রহমান বলেন, ‘ভেবেছিলাম, অন্তর্বর্তী সরকার এবার আমলাতন্ত্রকে চাপে রাখবে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হলো না।’

গত বছরের ১১ মে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস শেয়ারবাজারকে গতিশীল করতে পাঁচ দফা নির্দেশনা দেন। এর মধ্যে ছিল ভালো পারফরম্যান্স করা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা, বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা, ভালো করলেও তালিকাভুক্ত নয় এমন দেশীয় কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আসতে প্রণোদনা দেওয়া, বাজার সংস্কারে বিদেশি বিশেষজ্ঞ যুক্ত করা এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের ব্যাংক ঋণের বদলে শেয়ার ও বন্ড ছাড়ার মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহে উৎসাহিত করা। নির্দেশনার প্রায় ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও এর কোনোটিই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০১২ সালে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এরপর এক দশকের বেশি সময়েও আর কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাজারে আসেনি। বরং এ সময় কম পারফরম্যান্স করা বা জাঙ্ক কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ায় বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনার পর অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেয়। তবে সেই উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পর্যায়েই থমকে যায়। এর আগেও বিভিন্ন অর্থমন্ত্রী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নিলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেগুলো আলোর মুখ দেখেনি। 

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানির সম্ভাব্য একটি তালিকা করা হয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য কড়া নির্দেশও দিয়েছে। তবে সেখানেই অগ্রগতি আটকে যায়। তিনি বলেন, ‘বিএসইসি তার করণীয় করেছে। কিন্তু পরবর্তী ধাপগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর ওপর নির্ভর করে।’ 

প্রধান উপদেষ্টার আরেকটি নির্দেশনা ছিল ভালো পারফরম্যান্স করা দেশীয় কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনতে প্রণোদনা দেওয়া। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা অন্য কোনো সংস্থা থেকে এ ধরনের প্রণোদনার ঘোষণা আসেনি। এ ছাড়া, বিএসইসি আইপিও বিধিমালা সংশোধন করেছে, যাতে ভালো কোম্পানিগুলো ন্যায্য মূল্য পায়। তবে কর বা নীতিগত প্রণোদনা না থাকায় অনেক কোম্পানি আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বাজার সংস্কারে বিদেশি বিশেষজ্ঞ যুক্ত করার নির্দেশনাও বাস্তবায়িত হয়নি। 

এ বিষয়ে আবুল কালাম বলেন, বিদেশি বিশেষজ্ঞ যুক্ত করতে সময় বেশি লাগবে এমন সিদ্ধান্ত ওপর থেকে আসে। পরে বিদেশে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন দেশীয় শিক্ষাবিদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। বড় ঋণগ্রহীতাদের শেয়ার ও বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রেও তেমন অগ্রগতি নেই। যদিও বিএসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ড বাজার উন্নয়নে কিছু নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে। তবে বাজারে কারসাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিএসইসি কিছুটা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ৯ মাসে কোনো বড় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্তির বিষয়ে এটি স্পষ্ট ব্যর্থতা।’ 

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়টাই ছিল এসব সংস্কার বাস্তবায়নের সবচেয়ে ভালো সুযোগ। রাজনৈতিক সরকারের সময় আমলাতন্ত্রের অসহযোগিতার কারণে এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করা কঠিন হয়। এই সময়ের মধ্যে অন্তত চার-পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হলে বাজারে ইতিবাচক বার্তা যেত। বিএসইসি, এফআইডি ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কমিটি সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর অনীহার কারণে পুরো প্রক্রিয়া থমকে আছে। ফলে শেয়ারবাজার সংস্কারের উদ্যোগ লাল ফিতার জটিলতায় আটকে থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

বিকেপি/এমএইচএস

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

শেয়ারবাজার

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর