রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ৩.২ মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে জাপান
বাসস
প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬, ২০:৫৯
বাংলাদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় জাপান জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলকে (ইউএনএফপিএ) ৫০০ মিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ৩.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) অর্থ সহায়তা দিচ্ছে। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা মানবিক সংকটে নিজেদের দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনরায় নিশ্চিত করেছে জাপান।
দুই বছর মেয়াদি নতুন এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো- কক্সবাজার ও ভাসানচরে নারী ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা। জাপানের এই অর্থায়নে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং স্থানীয়দের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ বিষয়ক সেবাগুলো অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে।
রোহিঙ্গা সংকট এখনও বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। কক্সবাজারে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে। এছাড়াও সেখানে রয়েছে অসহায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী।
২০২৪ সাল থেকে নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে, যাদের অর্ধেকের বেশিই নারী ও কন্যাশিশু। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক সময়ে তহবিলের সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে, যার ফলে ২০২৫-২০২৬ সালের রোহিঙ্গা মানবিক সংকটের ‘যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা (জেআরপি)’ উল্লেখযোগ্যভাবে অর্থ সংকটে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে তহবিলের তীব্র ঘাটতির কারণে রোহিঙ্গাদের সেবায় নিয়োজিত সরকারি ছয়টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে মিডওয়াইফের সংখ্যা ১৬ শতাংশ এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (জিবিভি) মোকাবিলায় নিয়োজিত কর্মীদের সংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে।
এই সংকটকালীন সময়ে জাপানের এই সময়োপযোগী অনুদান একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে ইউএনএফপিএ প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষ সরাসরি সেবা প্রদানের পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা জরুরি প্রসূতি সেবা চালু থাকবে, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলা ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পাওয়া যাবে।
ইউএনএফপিএ’র প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং বলেন, ‘নারী ও মেয়েদের জন্য সংকটময় সময়ে জাপানের এই সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইউএনএফপিএ-কে সেই সকল জীবন রক্ষাকারী সেবা সচল রাখতে সহায়তা করবে, যা নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে, নতুবা তারা প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়ত। জাপানের এই নীতিগত ও ধারাবাহিক সহায়তার জন্য আমরা তাদের কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।’
জাপানের অর্থায়নে ইতোপূর্বে পরিচালিত উদ্যোগগুলোর দৃশ্যমান সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই এই নতুন ধাপটি শুরু হয়েছে। কক্সবাজার ও ভাসানচরে ইউএনএফপিএ সমর্থিত সেবা কেন্দ্রগুলো থেকে ইতোমধ্যে ৩৮ হাজারেরও বেশি নারী ও কন্যাশিশু প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করেছেন, যা জরুরি স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।
এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নারী-বান্ধব কেন্দ্র এবং নারীদের দ্বারা পরিচালিত কমিউনিটি সেন্টারগুলোর মাধ্যমে জিবিভি সারভাইভারদের জন্য বিশেষায়িত সেবা কার্যক্রম সফলভাবে সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যা হাজার হাজার অসহায় নারী ও কিশোরীর কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।
জাপানের সহায়তায় ভাসানচরে একটি ২০ শয্যার হাসপাতাল চালু করা হয়েছে, যা জীবনঝুঁকি রয়েছে এমন রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে। এর ফলে হাসপাতালটি চালুর পরবর্তী বছরগুলোতে মাতৃমৃত্যুর হার অত্যন্ত নিম্নপর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের ক্ষমতায়ন সংক্রান্ত উদ্যোগগুলো ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে জীবনদক্ষতা ও জেন্ডার সমতা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
২০১৭ সাল থেকে জাপান সরকার ইউএনএফপিএ-সহ বিভিন্ন জাতিসংঘ সংস্থা এবং এনজিওর মাধ্যমে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে ২৫ কোটিরও (২৫০ মিলিয়ন) বেশি মার্কিন ডলার প্রদান করেছে। এর ফলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা এবং স্থানীয়দের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে জাপান অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও অবিচল অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি আশা করেছেন, জাপান সরকারের সহায়তা রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী উভয়ের জীবনমান উন্নত করতে সহায়ক হবে।
জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি বলেন, ‘বাস্তুচ্যুত হওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এবং সবচেয়ে অসহায় মানুষ, বিশেষ করে নারী ও কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় জাপান দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। ক্রমবর্ধমান মানবিক ও অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, ইউএনএফপিএ’র সাথে আমাদের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আমরা অপরিহার্য স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা সেবাগুলোর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাই।’
ইউএনএফপিএ এবং জাপান সরকারের এই অংশীদারিত্বের লক্ষ্য হলো-আন্তর্জাতিক সংহতিকে অনুপ্রাণিত করা এবং রোহিঙ্গা সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও কন্যাশিশুদের সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষায় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা।

