Logo

অর্থনীতি

তেলে তুমুল তেলেসমাতি

Icon

হাসান রাজীব

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ২১:২২

তেলে তুমুল তেলেসমাতি

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। দীর্ঘ লাইন, প্যানিক বায়িং, জেলায় জেলায় তেল জব্দ, কালোবাজারি ও সহিংসতার নানা ঘটনা সামনে আসছে। তবে যদিও সরকার বলছে তেলের কোনো সংকট নেই। তবে এসবের মধ্যে বাস্তবতা হলো রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেল নিতে পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন এখন নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে।

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক চালক চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন। কোথাও ৩০ মিনিট, কোথাও এক থেকে দুই ঘণ্টা, কোথাও আবার দিনভর অপেক্ষা করেও নির্ধারিত সীমার বেশি তেল মিলছে না। এতে অফিসগামী, ডেলিভারি কর্মীসহ সাধারণ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের ভোগান্তি বাড়ছে কয়েকগুণ।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ফিলিং স্টেশনের বাইরে তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের চালকরা। কিন্তু পাম্পগুলো থেকে বলা হচ্ছে, তেল নেই। কোথাও ‘তেল নাই’ লেখা সাঁটিয়ে বিক্রি বন্ধ, কোথাও ‘সীমিত পরিসরে’ বিক্রি হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন চালকরা।

এদিকে, দেশে কোনো ধরনের তেলের সংকট নেই জানিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, সরকার আগাম তিন মাসের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তেলের আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে। 

শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সকালে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার মাহমুদুল হাসান চাঁদবাজার পরিদর্শনের সময় তিনি এসব কথা বলেন। তেল আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক বলেও জানান তিনি।

দেশে তেলের সংকট নেই: দেশে কোনো ধরনের তেলের সংকট নেই জানিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, সরকার আগাম তিন মাসের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তেলের আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে।

এছাড়া জ্বালানি সাশ্রয়ে নতুন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে, সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বাজার বন্ধ রাখা এবং মন্ত্রী ও সচিবদের ব্যয় ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনা।

গতকাল সকালে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার মাহমুদুল হাসান চাঁদবাজার পরিদর্শনের সময় তিনি আরও বলেন, গত ১৭ বছর ধরে শুধু উন্নয়নের বুলি শোনা গেছে, বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে এখন সেই বাস্তব চিত্র পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, টাঙ্গাইলের পার্ক বাজারের রাস্তা ও বাজার উন্নয়নের জন্য ইতোমধ্যে জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের (ডিডিএলজি) সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে এসব উন্নয়ন কাজ শুরু করা হবে।

এছাড়া পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বর্তমানে যে বৈশ্বিক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাতে পৃথিবীর সব দেশে তেলের সংকট রয়েছে এবং দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এখনও আমাদের সরকার তেলের দাম বৃদ্ধি করে নাই।

তিনি বলেন, আমাদের তেলের সংকট নেই; বিগত দিনে যেভাবে বিভিন্ন জেলায় ও পাম্পে তেল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, বর্তমানে এরচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। তবে আমাদের মাথায় রাখতে হবে, বিশেষ করে এ সময়টা গরম সময়। এই সময়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্নভাবে মবের মাধ্যমে সংকট সৃষ্টি করতে চায়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

তেলের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত অর্থমন্ত্রীর: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশ তেলের দাম বাড়ালেও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ডিজেল বা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি। সরকারি তহবিল রক্ষায় এবং জনস্বার্থে জ্বালানির মূল্য নিয়ে সহসা একটি সিদ্ধান্ত আসতে পারে। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে বৃহত্তর স্বার্থে এক পর্যায়ে হয়ত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে তেলের দাম বাড়লে ফার্টিলাইজার ও খাদ্যপণ্যের ওপর প্রভাব পড়বে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, যা বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।’

গতকাল চট্টগ্রামের কোরিয়ান ইপিজেডে আয়োজিত ‘ইয়ংওয়ান-সিআইইউ একাডেমিক এক্সিলেন্স স্কলারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের প্রথম লক্ষ্য হলো জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এর ওপর কোনো আপস করার সুযোগ নেই। জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে কৃষি ও শিল্প উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়বে। উচ্চমূল্যে জ্বালানি কেনার ফলে সরকারি তহবিলের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা সামাল দিতে সরকার কঠোর সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ৩০ শতাংশ জ্বালানি তেল রেশনিং করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আজ থেকে আমার নিজেরও ৩০ শতাংশ তেল রেশনিং শুরু হয়েছে; অতিরিক্ত প্রয়োজন হলে নিজের টাকায় কিনতে হবে।’

মন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন হুমকির মুখে পড়েছে, যা বাংলাদেশের ওপরও প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির প্রধান উৎস ওই অঞ্চলে যুদ্ধ চলার অর্থ হলো সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়া। তবে সরকার উচ্চমূল্যে বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে সরবরাহ চেইন সচল রেখেছে।

সিঙ্গাপুর থেকে এলো ২৭ হাজার টন ডিজেল: চট্টগ্রাম বন্দরে সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার ৩০০ টন ডিজেলের একটি চালান এসেছে। বর্তমানে পদ্মা অয়েল কোম্পানির জেটিতে তা খালাস করা হচ্ছে। গতকাল দুপুর ২টার দিকে ‘ইউয়ান জিং হে’ নামের তেলবাহী জাহাজটি ডলফিন জেটি-৬-এ বার্থিং করে।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান। তিনি জানান, আজ রাতে মালয়েশিয়া থেকে ৩৪ হাজার টন ডিজেল নিয়ে আরও একটি জাহাজ ভিড়বে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, ‘ইউয়ান জিং হে’ নামের জাহাজটি গতকাল শুক্রবার ভোরে বহির্নোঙরে এসে পৌঁছে। এটি বর্তমানে ডলফিন জেটিতে বার্থিং করেছে। তাছাড়া রাতে ‘শান গ্যাং ফা জিয়ান’ নামের আরও একটি জাহাজ জ্বালানি তেল নিয়ে বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নিয়ে আরেক একটি জাহাজ শনিবার আসার কথা রয়েছে বলেও জানান সৈয়দ রেফায়েত হামিম।

বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে জ্বালানি নিয়ে ৩৩টি জাহাজ ভিড়েছিল বন্দরে। এর মধ্যে ১৫টি জাহাজ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল, আটটি জাহাজ এলএনজি নিয়ে ও নয়টি জাহাজ তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে এসেছিল।

ভোলায় দুই হাজার লিটার তেল জব্দ: ভোলা সদর উপজেলার অভিযান চালিয়ে দুজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে প্রায় দুই হাজার লিটার অবৈধ জ্বালানি তেল জব্দ করে বাজারমূল্যে বিক্রি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড।

গতকাল সকালে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, ভেদুরিয়া ফেরিঘাট এলাকা থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে তেলগুলো উদ্ধার করা হয়।

সুজন বলেন, গোপন সংবাদে কোস্টগার্ডের একটি দল অভিযান চালিয়ে একটি স্টিল বডির বোট করে অবৈধভাবে জ্বালানি তেল পাচারের সময় দুজন চোরাকারবারিকে আটক করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে প্রায় দুই লাখ টাকা মূল্যের দুই হাজার লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়। পরে ওই তেল ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে ‘এ রহমান অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে’ বাজারমূল্যে বিক্রি করা হয়। আর আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে বোটসহ তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

তেল বিক্রি ও জরিমানা থেকে পাওয়া অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করা হয়েছে বলে কোস্টগার্ডের এ কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

চট্টগ্রামে ৩৭ হাজার লিটার তেল জব্দ: সারাদেশে অবৈধভাবে তেল মজুদের বিরুদ্ধে অভিযানের মধ্যে চট্টগ্রামের একটি লাইটার জাহাজ থেকে ৩৭ হাজার লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

গত বৃহস্পতিবার বিকালে নগরীর সদরঘাটের কাছে কর্ণফুলী নদীতে ‘ওটি কোরবান আলী শাহ‘ নামের সে লাইটার জাহাজ বা ছোট জাহাজে নৌবাহিনী ও কোস্টর্গাড সদস্যদের নিয়ে অভিযান চালান চট্টগ্রাম বন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাদিয়া আফরিন কচি।

বন্দর সচিব সৈয়দ রেফাত হামিম বলেন, অভিযানে অবৈধভাবে মজুদ করা মোট ৩৭ হাজার লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়েছে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রে সাদিয়া বলেন, তারা যে ডিজেল মজুদ করেছে তার কোনো ক্রয়াদেশ বা চাহিদার স্বপক্ষে যথাযথ কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। তারা বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি পণ্য বিপণন সংস্থা মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ডিপো থেকে তেল সংগ্রহ করে তা অবৈধভাবে মজুদ করেছে বলে প্রতীয়মান হয়।

এদিকে, পাম্প মালিকরা বলছেন, দেশে জ্বালানির স্থায়ী সংকট না থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং অতিরিক্ত চাহিদার কারণে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে আগাম তেল সংগ্রহের প্রবণতা বাড়ায় লাইনের চাপ আরো বেড়েছে।

অনেক পাম্পে শৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। কোথাও পুলিশ বা প্রশাসনের সহায়তায় লাইনের নিয়ন্ত্রণ রাখা হচ্ছে, আবার কোথাও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবুও চাপ কমছে না।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নির্ধারিত সীমার মধ্যে তেল নেওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক এড়িয়ে চললে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হতে পারে। একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয় বাড়ানো গেলে মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ লাইনের ভোগান্তিও অনেকটা কমে আসবে।

ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি খাতে চাপ তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার জ্বালানি সরবাহে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। অবৈধভাবে তেল মজুদের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যে অভিযান চালাচ্ছে তাতে গেল এক মাসে ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৮ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করার তথ্য দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন