জ্বালানিসংকটে বাড়ছে সুতা ও কাপড়ের বাজারের অস্থিরতা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৪৭
দেশের বস্ত্রশিল্পের হৃদপিণ্ড হিসেবে পরিচিত নরসিংদীর বাবুরহাট ও মাধবদী এলাকায় বইছে সংকটের হাওয়া। তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সুতার সরবরাহ যেমন কমেছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উৎপাদন খরচ। জ্বালানি সংকটের এই বহুমুখী প্রভাবে এখন দিশেহারা স্থানীয় তাঁতি, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের মোট কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ
জোগান দেয় নরসিংদীর এই অঞ্চল। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা জ্বালানি সংকটে সুতার
বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতি পাউন্ড সুতার
দাম ১০ থেকে ১২ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। মিলগুলোতে নিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকায়
উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কাপড়ের পাইকারি ও খুচরা বাজারে।
সরেজমিন বাবুরহাট ও মাধবদীর বড় বাজারগুলো
ঘুরে দেখা যায়, পাইকারি ক্রেতাদের উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক কম। স্থানীয় তাঁতি আবু
তাহের আক্ষেপ করে বলেন, "সুতা, রং থেকে শুরু করে শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর দাম এখন
আকাশছোঁয়া। উৎপাদন খরচ বাড়লেও কাপড়ের সঠিক দাম মিলছে না। ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন বড়
চ্যালেঞ্জ।" আরেক তাঁতি আব্দুল করিম জানান, আগে সপ্তাহে যেখানে ৪-৫টি অর্ডার পেতেন,
এখন একটি অর্ডার পাওয়াই দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসায়ী সুমন সাহা জানান, বাজারে পুঁজি
ধরে রাখাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে অর্ডার নিতে
ভয় পাচ্ছেন। তবে মাধবদীর ‘আনন্দ ইয়াং’-এর স্বত্বাধিকারী
বিনয় দেবনাথ কিছুটা আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, "পরিস্থিতি অনিশ্চিত হলেও
আমরা তাঁতিদের সুতা সরবরাহ বন্ধ করিনি। আশা করছি আগামী সপ্তাহে বাজার পরিস্থিতি আরও
পরিষ্কার হবে।"
জ্বালানি সংকটের আঁচ লেগেছে পরিবহন খাতেও।
ট্রাকচালক রহিম মিয়া ও মালিক জাকির হোসেনের মতে, তেলের সংকট ও বাড়তি খরচের কারণে ভাড়া
বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন তারা। কিন্তু ব্যবসায়ীরা পণ্য পরিবহন কমিয়ে দেওয়ায় নিয়মিত ট্রিপ
পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, কাজ কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন তাঁত শ্রমিকরা।
শ্রমিক রফিকুল ইসলাম জানান, আগে দম ফেলার সময় না থাকলেও এখন অনেক দিন কাজ ছাড়াই বসে
থাকতে হচ্ছে, ফলে পরিবার নিয়ে চলাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাজার বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা,
এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশীয় বস্ত্র খাত এক অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে। বিশেষ
করে আসন্ন উৎসবের মৌসুমের আগে এই অস্থিরতা কাটানো না গেলে প্রান্তিক তাঁতিরা দেউলিয়া
হয়ে যেতে পারেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, কাপড়ের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ক্রেতারাও
কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন।
ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, জ্বালানি সরবরাহ
স্বাভাবিক করার পাশাপাশি সুতার বাজারে যেন কোনো অসাধু সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি
করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। নরসিংদীর এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে
বাঁচাতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের খবর/ এম.আর

