ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন
বিশ্ব অর্থনীতিতে বাড়ছে আমেরিকার একাধিপত্য
বিজনেস ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৪৯
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতা মার্কিন অর্থনীতিকে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী করে তুলছে। যেখানে যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপ এবং এশিয়ার অনেক দেশ জ্বালানি ও সরবরাহ সংকটে ধুঁকছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিজের অর্থনৈতিক অবস্থানকে আরও সুসংহত করতে সক্ষম হয়েছে।
এক সময় মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর অতিমাত্রায়
নির্ভরশীল থাকলেও, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস
উৎপাদনকারী দেশ। ইরান যুদ্ধের ফলে ওমান উপসাগর বা হরমুজ প্রণালীতে জ্বালানি সরবরাহ
বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি ইউরোপ ও চীনের মতো আমদানিকারক
দেশগুলোর জন্য বিপর্যয় নিয়ে আসলেও, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জ্বালানি খাতের জন্য এটি
বিশাল মুনাফার সুযোগ তৈরি করেছে। আমেরিকান জ্বালানি কোম্পানিগুলো এখন বিশ্ববাজারে বিকল্প
সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করছে।
যুদ্ধের অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা
এখন ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ বিনিয়োগ খুঁজছেন। ঐতিহাসিকভাবেই এই পরিস্থিতিতে মার্কিন ডলারের
চাহিদা বেড়ে যায়। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যখন মুদ্রাস্ফীতি আর মুদ্রার মান ধরে
রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ‘সেফ হ্যাভেন’ হিসেবে মার্কিন
ডলার আরও শক্তিশালী হয়েছে। এর ফলে বিশ্ব বাণিজ্যে ডলারের একাধিপত্য অন্য যেকোনো সময়ের
চেয়ে বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের
দেশগুলো এবং ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড মার্টিন, রেথিওন এবং বোয়িং-এর মতো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী
প্রতিষ্ঠানগুলো শত শত কোটি ডলারের নতুন ক্রয়াদেশ পাচ্ছে। এই সামরিক রফতানি মার্কিন
জিডিপিতে বড় ধরণের ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করছে।
ইউরোপের দেশগুলো দীর্ঘ সময় ধরে সস্তা জ্বালানির
জন্য রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ইরান যুদ্ধের ফলে সেই সরবরাহ ব্যবস্থা
ভেঙে পড়ায় জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো শিল্পোন্নত দেশগুলো উৎপাদন খরচ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে।
অন্যদিকে, চীন তাদের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে মেটায়, যা এখন ঝুঁকির
মুখে। এই দেশগুলোর অর্থনৈতিক শ্লথগতির বিপরীতে আমেরিকার স্থিতিশীলতা তাদের বিনিয়োগের
প্রধান গন্তব্যে পরিণত করেছে। তবে এই আধিপত্যের মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী
যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে যে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করছে, তার আঁচ থেকে যুক্তরাষ্ট্রও পুরোপুরি
মুক্ত নয়। এছাড়া বিশ্ববাজারের এই মেরুকরণ ভবিষ্যতে নতুন কোনো অর্থনৈতিক জোটের জন্ম
দেয় কি না, সেদিকেও নজর রাখছেন বিশ্লেষকরা।
সবমিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে
অস্থিরতা আনলেও অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে নিয়ে গেছে।
‘আমেরিকান ডমিন্যান্স’ বা মার্কিন আধিপত্যের
এই নতুন অধ্যায় আগামী কয়েক দশকের বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বলে ধারণা
করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের খবর/ এম.আর

