ছবি: সংগৃহীত
মন্দা অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ২০২৫ সালে চমক দেখিয়েছে ব্যাংকিং খাত। বিশেষ করে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ ব্যাংকই আলোচিত বছরে রেকর্ড মুনাফা অর্জন করেছে। কয়েকটি ব্যাংক বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণ পর্যন্ত মুনাফা তুলে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। কোনো কোনো ব্যাংক মূল ব্যবসায় ভালো করতে না পারলেও অপরিচালন খাতে ভর করে বড় মুনাফা তুলে নিয়েছে। তবে কয়েকটি ব্যাংক এই সময়ে রেকর্ড লোকসানও করেছে।
ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে ২১টির মুনাফা উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। এরমধ্যে অন্তত দশটি ব্যাংক একক বছরের বিবেচনায় প্রতিষ্ঠা পরবর্তীতে রেকর্ড উচ্চতায় মুনাফা করেছে। অন্যগুলোর মধ্যে পাঁচটির মুনাফা কমেছে। আর বড় লোকসান করেছে চারটি। এ ছাড়া একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটিসহ ছয় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন অপ্রকাশিত রয়েছে।
ব্যাংক খাত ও শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংক খাতের ভালো-মন্দের বড় বিভাজন কমাতে হলে পুরো খাতের ওপর আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। এ ছাড়া খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায় বাড়লে ব্যাংকগুলো প্রভিশনিংয়ের চাপ কমবে। পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে ব্যাংকগুলোর সুশাসন। দুর্বল ব্যাংকগুলোর ওপর আমানতকারীদের আস্থা না বাড়লে এসব ব্যাংক কাক্সিক্ষত আমানত পাবে না। আর আমানত না পেলে তারল্যসংকটও কাটবে না।
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, যেসব ব্যাংকের সুশাসন রয়েছে, খেলাপি ঋণ কম এবং যথেষ্ট তারল্য ছিল সেসব ব্যাংক খুব ভালো মুনাফা করেছে। আর যেসব ব্যাংকে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে, খেলাপি ঋণ বেশি ও তারল্যসংকটে ভুগছে, সেসব ব্যাংক খারাপ করেছে।
তবে, কেউ কেউ মনে করছেন ব্যাংকিং খাতে ২০২৫ সালে যে মুনাফা হয়েছে, সেটি সামনের বছরগুলোতে স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তদের মতে, খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া বিশেষ ছাড়ে অনেক ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে। তাছাড়া, ট্রেজারি বিল ও বন্ডে সুদের হার অনেক বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলো সেখানে বিনিয়োগ করে নিশ্চিত ও ঝুঁকিমুক্ত মুনাফা তুলে নিচ্ছেন।
অবশ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রান্তিক প্রতিবেদনেও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিল-বন্ডে অধিক বিনিয়োগের তথ্য মিলছে। ২০২৪ সালের জুন শেষে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ছিলো ৩ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। সেটি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪০ শতাংশ বেড়ে ৫ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
আলোচিত বছরে ব্র্যাক ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৯ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৭ শতাংশের বেশি। তবে সিটি ব্যাংকের মুনাফার বড় মুনাফায় সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল সরকারি বিল ও বন্ডের। আগের বছর এই খাত থেকে ১ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা আয় আসলেও গত বছর এসেছে ৩ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। আর পূবালী ব্যাংকের আমানত স্থিতি ২১ শতাংশ বেড়ে ৯৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ১৬ শতাংশ বেড়ে ৭২ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ বড় মুনাফা করা তিনটি ব্যাংকের মধ্যে দুটি ব্যাংকে আমানত বাড়লেও একটির মুনাফা বিল ও বন্ডে নির্ভর করে বেড়েছে। রেকর্ড মুনাফা করা অন্য ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও কোন কোনটিতে আমানত বেড়েছে এবং কোনটিতে সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে মুনাফায় প্রবৃদ্ধি এসেছে।
কোন ব্যাংক কত মুনাফা করলো: ২০২৫ সালে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি। বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ৫৭ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ২৫১ কোটি টাকা হয়েছে। এটি একক বছরের ব্যাংকটির সর্বোচ্চ মুনাফার রেকর্ড। ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছরে সিটি ব্যাংকের মুনাফা ৩১ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা হয়েছে। বছরের ব্যবধানে ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ২০২৫ সালে পূবালী ব্যাংকের নিট মুনাফা হয়েছে ১০৯০ কোটি টাকা। এটি প্রথমবারের মতো ব্যাংকটির হাজার কোটির বেশি মুনাফা অর্জনের রেকর্ড।
রেকর্ড মুনাফার বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ২০২৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংক যে নিট মুনাফা অর্জন করেছে এটি কোনো চমক নয়, বরং ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সমন্বিত কাজের ফল। দেশের বাজার পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমরা সবসময় ব্যাংকে কার্যকর সুশাসন ও মজবুত ভিত্তি ধরে রাখতে পেরেছি। ধারাবাহিক সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ মুনাফা অর্জিত হয়েছে।
সিটি ব্যাংকের এমডি ও সিইও মাসরুর আরেফিন বলেন, কোর ব্যাংকিং সেগমেন্ট থেকে তাদের শক্তিশালী আয় এসেছে। বিশেষ করে তাদের রিটেইল ব্যাংকিং ও কার্ড ব্যবসা করপোরেট ব্যাংকিংয়ের আয়ের চেয়ে এগিয়ে গেছে, যা গত বছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি তাদের স্মল বিজনেস, ন্যানো ও রিটেইল লোন এবং ক্রেডিট কার্ড পোর্টফোলিওর ঋণের গুণগত মানও সন্তোষজনক ছিল। এছাড়া এলসি ব্যবসায় নেতৃত্ব এবং আমানতের ব্যয় ৫ দশমিক ৫ শতাংশে ধরে রাখায় তারা এই বড় মুনাফা অর্জনে সক্ষম হয়েছে।
আর পূবালী ব্যাংকের এমডি ও সিইও মোহাম্মদ আলী বলেন, ঋণ প্রদান, বিনিয়োগ, নিয়োগ, পদোন্নতি থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে সুশাসনের চর্চা থাকলে কোনো ব্যাংকেরই খারাপ হওয়ার কথা হয়। পূবালী ব্যাংকে সুশাসনের চর্চা কার্যকর আছে। এ কারণে গত কয়েক বছর আমরা ধারবাহিক সাফল্য পেয়ে আসছি।
আলোচিত বছরটিতে এই তিনটি ব্যাংকের পাশাপাশি ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকেও রেকর্ড মুনাফা অর্জিত হয়েছে। পাশাপাশি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), এনআরবি ব্যাংক এবং এনআরবিসি ব্যাংকে গত বছর মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
মুনাফায় ভাটা ও বড় লোকসানে যে ব্যাংকগুলো: ২০২৫ সালে যে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমেছে, সেগুলোর তালিকায় প্রথমে রয়েছে ওয়ান ব্যাংক পিএলসি। এই ব্যাংকটির মুনাফা বছরের ব্যবধানে ১০২ কোটি টাকা কমে ৩০ কোটিতে নেমেছে। বছরটিতে ট্রাস্ট ব্যাংকের মুনাফা ৩৬ কোটি টাকা কমে ৩৩৬ কোটি টাকা হয়েছে। এ ছাড়া বছরের ব্যবধানে এসবিএসি ব্যাংকের মুনাফা ১১ কোটি থেকে ১ কোটিতে, রূপালী ব্যাংকে ১১ কোটি থেকে ৭ কোটিতে এবং স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংকে ৮৩ কোটি থেকে ৮০ কোটি টাকায় নেমেছে।
এদিকে গত বছর সবচেয়ে বেশি লোকসান হয়েছে এবি ব্যাংক পিএলসির। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট লোকসানের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ১০৪ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা হয়েছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকটি ১ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছিল। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লোকসান হয়েছে আইএফআইসি ব্যাংকে, যার পরিমাণ ২ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। আগের বছর ব্যাংকটি ১২১ কোটি টাকা লোকসান করেছিল। ২০২৪ সালে ১ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা লোকসান করা ন্যাশনাল ব্যাংকে গত বছর ২ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এ ছাড়া আগের বছর ১৩৪ কোটি টাকা মুনাফা করা প্রিমিয়ার ব্যাংকে ২০২৫ সালে ৯৯৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

