সরকারের সবুজ সংকেত পেয়ে ভোজ্যতেল বিপণনকারী কোম্পানিগুলো সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাতেও কাঙ্ক্ষিত সরবরাহ ফেরেনি বাজারে। দেশের বাজারে প্রায় তিন মাস ধরে চলা বোতলজাত সয়াবিন তেলের তীব্র সংকট এখনো কাটেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে সম্প্রতি লিটারপ্রতি ৪ টাকা দাম বাড়ানোর অনুমতি দেয় সরকার। তবে নতুন বর্ধিত মূল্য কার্যকর হওয়ার পরও খুচরা বাজারে বোতলজাত তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের ভোগান্তি এখন চরমে পৌঁছেছে।
সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত
অনুযায়ী বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়ে নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন
দর অনুযায়ী, এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা এবং
খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮০ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া
পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৭৫ টাকা।
অভিযোগ উঠেছে, দাম বাড়ানোর এই ঘোষণার পরও
মিল মালিক ও পরিবেশকদের পক্ষ থেকে বাজারে কৃত্রিম সংকট ধরে রাখা হয়েছে। রাজধানীর কারওয়ান
বাজার, যাত্রাবাড়ী, হাতিরপুল ও সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা
গেছে, অধিকাংশ মুদি দোকানেই বোতলজাত সয়াবিন তেলের দেখা মিলছে না। কিছু দোকানে সীমিত
আকারে তেল থাকলেও তা নির্দিষ্ট পরিচিত ক্রেতা ছাড়া অন্যদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে না।
সেগুনবাগিচায় বাজারে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী
সাইমুম হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগে দোকানে গেলেই চাহিদা মতো যেকোনো ব্র্যান্ডের
তেল পাওয়া যেত। এখন ৫-৬টি দোকান ঘুরেও এক লিটারের একটা বোতল মিলছে না। কোম্পানিগুলোর
দাবি মেনে সরকার তেলের দাম বাড়াল, কিন্তু আমাদের ভোগান্তি তো কমলোই না, বরং আরও বাড়ল।
খুচরা ব্যবসায়ীরা এই সংকটের জন্য সরাসরি
বড় বড় আমদানিকারক ও পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলোকে দায়ী করছেন। কারওয়ান বাজারের এক মুদি
ব্যবসায়ী জানান, মিল পর্যায় থেকে বোতলজাত তেল সরবরাহ প্রায় বন্ধ রাখা হয়েছে। কোম্পানিগুলো
চাহিদার তুলনায় মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ মাল দিচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক বিক্রেতা বলেন,
বাজারে যারা কোটি কোটি টাকার তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, তারা সবসময়ই ধরাছোঁয়ার
বাইরে থেকে যায়। আর বাজারে তেল না পেয়ে ক্রেতারা এসে আমাদের ওপর রাগ ঝাড়েন, প্রশাসনও
এসে খুচরা ব্যবসায়ীদের জরিমানা করে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল মিল মালিকদের
কারসাজিই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় এক লাফে
অনেকটা বেড়ে গেছে। এর ওপর গত কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ
ও সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে, যা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। পাইকারি ব্যবসায়ীদের
দাবি, মিল থেকে পণ্য খালাস করে বিভিন্ন জেলা ও রাজধানীর আড়তগুলোতে পৌঁছাতে এখন আগের
চেয়ে অনেক বেশি সময় ও খরচ লাগছে।
এদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের
(ক্যাব) মতে, মিলারদের চাপ ও লবিংয়ের মুখে তেলের দাম বাড়ানো হলেও বাজার তদারকিতে সরকারের
কার্যকর কোনো ভূমিকা নেই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কিংবা জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের
দৃশ্যমান কোনো কঠোর নজরদারি না থাকায় আমদানিকারকেরা নিজেদের সুবিধামতো সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ
করছেন। ভোক্তাদের দাবি, অবিলম্বে মিল ও পাইকারি আড়তগুলোতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে সরবরাহ
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা না হলে, সামনে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

