Logo

অর্থনীতি

মাছ-মাংসের পর এবার সবজির বাজারেও আগুন

Icon

বিজনেস ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ২০:৪১

মাছ-মাংসের পর এবার সবজির বাজারেও আগুন

রাজধানীর কাঁচাবাজারে যেন আগুন লেগেছে। মাছ, মাংস কিংবা ডিমের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিল আগেই, এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো নিত্যদিনের সবজিও। সামান্য ঢেঁড়স ছাড়া বাজারের প্রায় সব ধরনের সবজিই এখন ৮০ থেকে ১২০ টাকার ঘরে ওঠানামা করছে। একই সঙ্গে চড়া মূল্যে বিক্রি হচ্ছে ব্রয়লার মুরগি ও ডিম। আর সাধারণ মানুষের প্রোটিনের শেষ ভরসা পাঙাশ কিংবা তেলাপিয়া মাছের কেজিও এখন ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, রামপুরা, মালিবাগ, মগবাজার ও মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেটসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যের এই ভয়ংকর চিত্র দেখা গেছে। বাজারে এসে খরচের হিসাব মেলাতে না পেরে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন সাধারণ ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা।

রাজধানীর বাজারে হাতে গোনা দুই-একটি সবজি ছাড়া সিংহভাগ সবজির কেজিই সেঞ্চুরি পার করেছে। আজকের বাজারে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ঢেঁড়স, যা প্রতি কেজি ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাকি সবজিগুলোর মধ্যে কেবল পটোল ও বরবটি ৮০ টাকা কেজিতে পাওয়া যাচ্ছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি লম্বা বেগুন ১০০ টাকা, গোল বেগুন ১২০ টাকা, করলা ১০০ টাকা, ঝিঙ্গা ১০০ টাকা এবং চিচিঙ্গা ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া পেঁপে ১০০ টাকা, কাঁকরোল ১২০ টাকা, ধন্দুল ১০০ টাকা, গাজর ১২০ টাকা এবং প্রতি পিস লাউ ১০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। কাঁচামরিচের ঝাল আরও বেড়ে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়।

রামপুরা বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকুরিজীবী হাফিজ উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাজারে ১০০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। মাছ-মাংসের দাম তো আগে থেকেই চড়া, এখন যদি সবজির কেজিও ১০০ টাকা হয়, তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ কী খেয়ে বাঁচবে? আগে যেখানে এক কেজি করে সবজি কিনতাম, এখন বাধ্য হয়ে আধা কেজি বা আড়াইশ গ্রাম করে কিনছি। বাজারে কোনো সরকারি মনিটরিং নেই, বিক্রেতারা যে যার মতো দাম হাঁকাচ্ছে। সবজি বিক্রেতারা অবশ্য সরবরাহ সংকট ও বাড়তি পরিবহন খরচকে দায়ী করছেন।

মালিবাগ বাজারের বিক্রেতা সিরাজুল ইসলাম জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রাকে করে ঢাকায় সবজি আনতে এখন অতিরিক্ত ভাড়া গুণতে হচ্ছে। পাশাপাশি বেশ কিছু সবজির মৌসুম শেষ দিকে হওয়ায় এবং সাম্প্রতিক বৈরী আবহাওয়ার কারণে ঢাকার বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। ফলে পাইকারিতেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

সবজির চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা মাছের বাজারে। একটা সময় নিম্নবিত্তের অন্যতম ভরসা ছিল পাঙাশ ও তেলাপিয়া মাছ, কিন্তু এখন বাজারে ২০০ টাকার নিচে কোনো মাছই পাওয়া যাচ্ছে না। মাঝারি আকারের পাঙাশ মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায় এবং তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকা কেজি দরে। বাজারে অন্যান্য মাছের মধ্যে রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ টাকা, দেশি কই ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং শিং মাছ ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। একটু ভালো মানের টাকি মাছ ৪০০ টাকা এবং শৈল মাছ ৭০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। আকারভেদে এক কেজির বেশি ওজনের একেকটি ইলিশ মাছের দাম ৩ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। নদীর মাছ খাওয়ার শৌখিনতা এখন সাধারণ মানুষের জন্য বিলাসিতা মাত্র। বাজারে নদীর বেলে মাছের কেজি ৫০০ টাকা এবং দেশি টেংরা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বিক্রেতা সোহাগ মিয়া জানান, নদী ও হাওরাঞ্চলে মাছ ধরা কমে যাওয়া এবং জালের দামসহ আনুষঙ্গিক খরচ বাড়ায় আড়তগুলোতেই মাছের দাম চড়া।

ঈদের পর মুরগির বাজারে যে সামান্য স্বস্তি ফিরেছিল, তা মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে উধাও হয়ে গেছে। গত সপ্তাহে ১৭৫ টাকায় বিক্রি হওয়া ব্রয়লার মুরগির দাম এক লাফে ২৫ টাকা বেড়ে এখন ২০০ টাকা কেজিতে ঠেকেছে। সোনালি মুরগির কেজি ৩০০-৩২০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকায়। আর বাজারে দেশি মুরগির সরবরাহ এতটাই কম যে, ক্রেতাকে প্রতি কেজির জন্য ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। মুরগির মাংসের পাশাপাশি মধ্যবিত্তের পকেটে টান দিচ্ছে ডিমের বাজারও। গত সপ্তাহের ১২০ টাকা ডজনের ডিম শনিবার বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। বাজারে ডিমের আকার ও রঙের ওপর ভিত্তি করে দামের কিছুটা তফাত দেখা গেছে। বড় সাইজের ব্রাউন কালারের ডিমের ডজন ১৫০ টাকা হলেও সাদা ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। অন্যদিকে, বড় আকারের ব্রয়লার ডিম ১৬০ টাকা ডজন দরেও বিক্রি হতে দেখা গেছে।

কাঁচাবাজারের এই লাগামহীন উর্ধ্বগতিতে দিশেহারা সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, চাল, ডাল, তেল ও নুন কেনার পর মাছ, মাংস ও সবজি কিনতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিত্যপণ্যের এই বাজারের ওপর সাধারণ মানুষের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

বাজার সংশ্লিষ্ট ও ভোক্তা অধিকার রক্ষা আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, কেবল সরবরাহ সংকট বা পরিবহন ব্যয়ের অজুহাতে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডিম, মুরগি ও সবজির দাম এত টাকা বাড়তে পারে না। এর পেছনে মধ্যস্বত্বভোগী ও বড় পাইকারদের কারসাজি স্পষ্ট। নিয়মিত বিরতিতে যদি ঢাকার বড় বড় আড়ত ও কাঁচাবাজারগুলোতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিং টিম কঠোর অভিযান না চালায়, তবে এই অস্থিরতা আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়বে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে।

 

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন