বৃষ্টি-বন্যায় সরবরাহে বিঘ্ন
নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ১৬:১৫
ছবি: সংগৃহীত
দেশজুড়ে এক সপ্তাহের টানা ভারী বর্ষণ এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ভয়াবহ বন্যার কারণে সারা দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এর ফলে চাল, ডাল, তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
একদিকে সাগর উত্তাল ও বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের পাইকারি বাজারগুলোতে বেচাকেনা ও পণ্য পরিবহন থমকে গেছে।
মৌসুমি বৃষ্টিতে কৃষিজমি তলিয়ে যাওয়ায় এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে শাকসবজির সরবরাহ কমে গেছে, যার ফলে পাইকারি বাজারে সবজির দাম প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ ছাড়া, বন্যাকবলিত এলাকায় ব্যাপক ত্রাণ কার্যক্রমের কারণে চিড়া, মুড়ি, সেমাই, বিস্কুট ও খেজুরের মতো শুকনা খাবারের চাহিদা ও দাম উভয়ই বেড়েছে।
দেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো জানিয়েছে, জলাবদ্ধতা ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে তারা চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম পণ্য সরবরাহ করতে পারছে। যদিও ডিলার ও পাইকারি বাজারে এখনো চাল, ডাল, চিনি ও তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, তবে এই পরিবহনসংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী হলে আগামী দিনগুলোতে দেশের সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতিতে মারাত্মক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলে ব্যবসায়ীরা সতর্ক করেছেন।
বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গাজী বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘সাধারণত প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০টি লাইটার জাহাজ বড় জাহাজ থেকে পণ্য বোঝাই করে। কিন্তু গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন মাত্র ৫ থেকে ১০টি লাইটার জাহাজ পণ্য বোঝাই করতে পেরেছে।’
সমুদ্রের পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো হওয়ায় সোমবার সকালে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ শুরু হয়েছে। তবে গাজী বেলায়েত জানান, এদিন পর্যন্ত ৪০০টির বেশি লাইটার জাহাজ পণ্য বোঝাইয়ের অপেক্ষায় ছিল। কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে।
চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই ও আসাদগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানান, আশপাশের জেলার ক্রেতারা আসতে না পারায় তাদের দৈনিক বেচাকেনা ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ী আমিনুল হক বলেন, ‘বিভিন্ন জেলার পাইকারি ক্রেতারা আসতে না পারায় ব্যবসা কমে গেছে।’
তবে শুকনা খাবারের চাহিদা বেড়েছে। চিড়া, মুড়ি ও সেমাইয়ের দাম প্রতি কেজিতে তিন থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
সাধারণ মানের ২৫ কেজির এক বস্তা চিড়ার পাইকারি দাম এক সপ্তাহ আগের এক হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন দাম বেড়ে এক হাজার ৩০০ টাকা হয়েছে। মুড়ির দাম প্রতি কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বেড়ে ৬৫ থেকে ৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৩০ কেজির এক ঝুড়ি খোলা সেমাইয়ের দাম ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ৫০ টাকা হয়েছে। খেজুরের দামও প্রতি কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে।
আমিনুল হক বলেন, ‘আমাদের ধারণা, বন্যার কারণে সাময়িকভাবে দাম বেড়েছে।’
ভারী বৃষ্টিতে ট্রাকে নিত্যপণ্য বোঝাইয়ের কাজও ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে পরিবহনসংকট।
চট্টগ্রাম বিভাগের ৪০৮টি ইউনিয়ন বন্যা, জলাবদ্ধতা ও ভূমিধসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খাগড়াছড়ির প্রায় ৭৩ শতাংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া, চট্টগ্রামের ৫০ শতাংশ ও কক্সবাজারের ৪৯ শতাংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের কারণে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। ফলে এসব জেলায় পণ্য পরিবহন কঠিন হয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা জানান, এত বিঘ্ন সত্ত্বেও পাইকারি বাজারে চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। তবে বৃষ্টি ও বন্যা অব্যাহত থাকলে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
চট্টগ্রামের মতো ঢাকার পাইকারি ব্যবসায়ীরাও পণ্য সরবরাহে বিঘ্নের কথা জানিয়েছেন।
ঢাকার কারওয়ান বাজারে সবজির পাইকারি ব্যবসায়ী মোস্তফা কামাল বলেন, ‘ভারী বৃষ্টি ও বন্যার কারণে সরবরাহ কমেছে। এই কারণে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে পাইকারি দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে ফসল সংগ্রহ ও পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। ফলে কৃষক বাজারে কৃষিপণ্য ঠিক মতো আনতে পাছে না।’
কারওয়ান বাজারের মুদি ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে ভোজ্যতেল, চিনি ও আটার সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। চার-পাঁচ দিন ধরে কোম্পানিগুলো চাহিদার অর্ধেক পণ্যও দিতে পারছে না।’
তিনি জানান, পাইকারি দাম সামান্য বাড়লেও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের কারণে কিছু নিত্যপণ্যের, বিশেষ করে শুকনা খাবারের খুচরা দাম বেড়েছে।
কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী জানিয়েছে, বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে তাদের সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। ফলে পণ্য সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের হিসাব বিভাগের প্রধান এস এম মুজিবুর রহমান জানান, প্রতিষ্ঠানটি সাধারণত প্রতিদিন ২৮০ থেকে ৩০০ টন পণ্য সরবরাহ করে। কিন্তু বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন মাত্র ৫০ থেকে ৬০ টন পণ্য সরবরাহ হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রামে আমাদের ডিপোতে সব পণ্য খালাস করা সম্ভব হয়নি। এতে সরবরাহ পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।’
টিকে গ্রুপের অর্থ ও পরিচালন বিভাগের পরিচালক মো. শফিউল আথার তাসলিম বলেন, ‘দুই-তিনদিন ধরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খাচ্ছি আমরা। যানবাহন পাওয়া গেলেও রাস্তার পরিস্থিতির কারণে সেগুলো অনেক এলাকায় পৌঁছাতে পারেনি।’
তিনি জানান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও সিলেট শহরের কিছু এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। তবে ডিলারদের কাছে পর্যাপ্ত পণ্য মজুত থাকায় এর প্রভাব এখনো খুব একটা পড়েনি।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

