Logo

অর্থনীতি

লভ্যাংশহীন বন্ধ কোম্পানির দাপট, ঝুঁঁকিতে বিনিয়োগকারী

Icon

এম এম হাসান

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ২১:২৪

লভ্যাংশহীন বন্ধ কোম্পানির দাপট, ঝুঁঁকিতে বিনিয়োগকারী

ছবি: সংগৃহীত

টানা পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে শেয়ারধারীদের কোনো ধরনের নগদ কিংবা বোনাস লভ্যাংশ দেয়নি দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ২১টি কোম্পানি। এর মধ্যে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রমও বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। আর বাকিগুলো দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে চলছে। বিদ্যমান তালিকাভুক্তি বিধিমালা অনুযায়ী এসব কোম্পানির অনেক আগেই শেয়ারবাজার থেকে বাদপড়ার কথা থাকলেও এখনো সেগুলোর লেনদেন চলছে। এমনকি কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারের বাজারদর দেশের অনেক শক্তিশালী ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের চেয়েও বেশি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, এই ২১ কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীদের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। কিন্তু বছরের পর বছর এসব বিনিয়োগ থেকে কোনো ধরনের লভ্যাংশ পাননি শেয়ারধারীরা। এর মধ্যে ১৫টি কোম্পানি ২০১৬ সালের পর থেকে নগদ বা বোনাস, কোনো ধরনের লভ্যাংশই দেয়নি।

লভ্যাংশবিহীন কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ সার্ভিসেস, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, হামি ইন্ডাস্ট্রিজ, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, জুট স্পিনার্স, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক ইন্ডাস্ট্রিজ, মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, মিথুন নিটিং অ্যান্ড ডাইং, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, সাভার রিফ্র্যাক্টরিজ, শ্যামপুর সুগার মিলস, তাল্লু স্পিনিং মিলস, তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইং এবং জিল বাংলা সুগার মিলস।

এ ছাড়া আরও ছয়টি কোম্পানি গত এক দশকে একবার সামান্য বোনাস শেয়ার দিলেও গত পাঁচ বছরে কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। এগুলো হলো অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স, ডেল্টা স্পিনার্স, ফ্যামিলিটেক্স বিডি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, রিং শাইন টেক্সটাইলস এবং উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি।

ডিএসইর তালিকাভুক্তি বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি সর্বশেষ লভ্যাংশ ঘোষণার পর টানা পাঁচ বছর নগদ বা বোনাস লভ্যাংশ না দিলে প্রয়োজনে সেই কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করা যেতে পারে। তবে বাস্তবে এই বিধান দীর্ঘদিন কার্যকর হয়নি।

এ বিষয়ে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, তুলনামূলক কম পরিশোধিত মূলধন থাকায় এসব কোম্পানির শেয়ার সহজেই কারসাজির শিকার হয়। একটি চক্র কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে। অনেকেই প্রকৃত আর্থিক অবস্থার পরিবর্তে দামের ঊর্ধ্বগতির দিকে তাকিয়ে বিনিয়োগ করেন এবং পরে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রমহীন বা লোকসানি কোম্পানিগুলো বাজারে থাকায় পুরো পুঁজিবাজারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মৌলভিত্তি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম বেশি হওয়া বাজারের জন্য অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করছে। তার মতে, নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির পাশাপাশি অযোগ্য কোম্পানিগুলোকেও নিয়মিতভাবে বাজার থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।

দুর্বল শেয়ারে সার্কিট ব্রেকারের সীমা কমানোর সিদ্ধান্ত: বন্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিগুলোর অস্বাভাবিক দাম ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে প্রথমে বিনিয়োগাকারীদের উদ্দেশ্যে সতর্ক বার্তা প্রকাশ করে ডিএসই। পাশাপাশি সম্প্রতি দীর্ঘ এক দশক পর ‘রিয়েল-টাইম অ্যাকশন’ পদ্ধতিও ফিরিয়ে এনেছে স্টক এক্সচেঞ্জটি। এই পদ্ধতিতে অস্বাভাবিক উত্থান ও লেনদেন ঠেকাতে তাৎক্ষণিক একদিনের জন্য লেনদেন কার্যক্রম স্থগিত করা হচ্ছে। এতেও কার্যকারী ফল না আসায় সম্প্রতি বন্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিগুলোর অস্বাভাবিক দাম ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে দৈনিক সার্কিট ব্রেকার বা মূল্য পরিবর্তনের সীমা অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেয় ডিএসই।

ওই আবেদনের পরিপেক্ষিতে এরই মধ্যে দুই শেয়ারবাজার ডিএসই ও সিএসইকে সার্কিট ব্রেকারের সীমা নির্ধারণে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এখন পর্যালোচনা করে অস্বাভাবিক উত্থান বন্ধে কোন শেয়ারগুলোতে সার্কিট ব্রেকারের সীমা পুনর্নির্ধারণ করা হবে, সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে স্টক এক্সচেঞ্জ। বর্তমানে শেয়ারবাজারের সব কোম্পানির ক্ষেত্রে দৈনিক শেয়ারদর ওঠানামায় সার্কিট ব্রেকারের সীমা রয়েছে ১০ শতাংশ। অর্থাৎ একটি শেয়ারের দাম একদিনে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বাড়তে বা কমতে পারে। দুর্বল কোম্পানির ক্ষেত্রে এই সীমা কমিয়ে অর্ধেক তথা পাঁচ শতাংশ করা হতে পারে।

ডিএসই মনে করে, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলে দুর্বল আর্থিক অবস্থার কোম্পানিগুলোর শেয়ারে অতিরিক্ত জল্পনা-কল্পনা ও অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ও পতনের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, মূল্য কারসাজির সুযোগ কমানো এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি হ্রাসেও সহায়ক হবে।

তবে শেয়ারবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আল-আমিন মনে করেন, দুর্বল বা লোকসানি কোম্পানির শেয়ারদরে অস্বাভাবিক ওঠানামা ঠেকাতে সার্কিট ব্রেকার সীমা কমানোর প্রস্তাব স্বল্পমেয়াদে কিছু নিয়ন্ত্রণ আনতে পারে। তবে এটি সমস্যার মূল সমাধান নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ কোম্পানির দুর্বল ব্যবস্থাপনা, আর্থিক সংকট ও পরিচালনা পর্ষদের অকার্যকারিতা।

তিনি আরও বলেন, শুধু শেয়ারের দামের গতি নিয়ন্ত্রণ করে কোম্পানিকে সুস্থ করা সম্ভব নয়। বরং কোম্পানিগুলোর অবস্থা মূল্যায়ন করে প্রয়োজন হলে বোর্ড পুনর্গঠন, নীতিগত সহায়তা এবং কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

প্রকৃত সমাধান তাহলে কোথায়: এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেটের (বিআইসিএম) নির্বাহী প্রেসিডেন্ট ওয়াজিদ হাসান শাহ বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের বিষয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বাড়াতে বিনিয়োগ শিক্ষার বিকল্প নেই। আমরা বিআইসিএমের পক্ষ থেকে নিয়মিত বিনিয়োগ শিক্ষার পরিধি বাড়াতে কাজ করছি। আমাদের শেয়ারবাজারে অনেক বিনিয়োগকারীই স্বল্প সময়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ রিটার্ন নেওয়ার মানসিকতা রাখেন, যেটি বাস্তবসম্মত নয়। যারা এই ধরনের লোভ করেন, তাদের একশ্রেণি বারবার লোকসান করার পরও আবারো দুর্বল শেয়ারে ঝুঁকি নেন। বস্তুতপক্ষে ওইসব শেয়ারে একটি চক্র বড় রিটার্ন নেওয়ার পর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঘাড়ে ঝুঁকি চাপিয়ে দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, যেসব কোম্পানিতে দীর্ঘ বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে, সেগুলো তালিকাচ্যুত করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে দেখার বিষয় হলো- তালিকাচ্যুত করা হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হয়ে যাবেন কিনা? তাদের বিনিয়োগের ন্যূনতম অংশ হলেও ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে তালিকাচ্যুতর পথে এগোতে হবে। অন্যথায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাঁচটি ব্যাংকের লেনদেন বন্ধ হওয়ায় শেয়ারবাজারে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, সেই প্রভাব আবারও পড়তে পারে।

ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুজহাত আনোয়ার বলেন, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। তার মতে, দীর্ঘদিন সিদ্ধান্ত না হওয়ায় সমস্যা আরও জটিল হয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি কোম্পানির অবস্থা পৃথকভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে।

তিনি আরও জানান, যেসব কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ থাকলেও অস্বাভাবিকভাবে শেয়ারের দাম বাড়ছিল, তাদের কয়েকটির লেনদেন ইতোমধ্যে সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভালো মৌলভিত্তির নতুন কোম্পানিকে বাজারে আনার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে, যাতে বিনিয়োগকারীদের সামনে আরও উন্নত বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়।

এদিকে সম্প্রতি বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, বিশ্বের অধিকাংশ পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন অকার্যকর কোম্পানিকে অনির্দিষ্টকাল তালিকাভুক্ত রাখা হয় না। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তার মতে, অকার্যকর কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উৎপাদনে ফিরতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদেরও কার্যক্রমহীন, বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) না করা এবং নিয়মিত লভ্যাংশ না দেওয়া কোম্পানিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

ডিএসইর একাধিক সূত্র জানায়, অতীতে এসব কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিনিয়োগকারীদের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। তবে এবার বাজারকে আরও স্বচ্ছ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ করতে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন