Logo

অর্থনীতি

মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল চাহিদায় ঝুঁকছে বহুজাতিক কোম্পানি

Icon

এম এম হাসান

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ২১:০৪

মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল চাহিদায় ঝুঁকছে বহুজাতিক কোম্পানি

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ভোক্তা চাহিদা ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বেশির ভাগ বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মুনাফায় ভাটা পড়েছে। কয়েকটি কোম্পানির মুনাফা কমেছে এবং কয়েকটিকে গুনতে হয়েছে লোকসান। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও কয়েকটি কোম্পানির মুনাফায় প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে। 

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এর সঙ্গে জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণের বাড়তি খরচ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা কোম্পানিগুলোর বিক্রি ও মুনাফায় চাপ তৈরি করেছে।

এ বিষয়ে রয়্যাল ক্যাপিটালের গবেষণা বিভাগের প্রধান আকরামুল আলম বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো দুর্বল। বাড়তি উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতি ও সরকারের নীতিগত অবস্থান ভোক্তার চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে। আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি কমার পাশাপাশি ভোক্তার আস্থা বাড়লে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে টেকসই গতি ফিরলে করপোরেট খাতের মুনাফাও বাড়তে পারে।

জানুয়ারি-ডিসেম্বর সময়ে অর্থবছর গণনা করা দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ১১টি বহুজাতিক কোম্পানির সব তাদের চলতি বছরের প্রথমার্ধের (জানুয়ারি-জুন) আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে চারটির মুনাফা কমেছে। দুটি লোকসানে রয়েছে। ওই দুই কোম্পানির একটি দীর্ঘ সময় ধরে ঋণের ভারে লোকসানে রয়েছে এবং আরেকটি নতুন করে লোকসানে পড়েছে। আর চারটি কোম্পানির মুনাফা বেড়েছে এবং একটি কোম্পানি লোকসান থেকে মুনাফায় ফিরেছে। 

আর্থিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ওই ১১টি বহুজাতিক কোম্পানির ছয়টি দুর্বল পারফরম্যান্স করলেও সম্মিলিতভাবে সবগুলো কোম্পানির নিট মুনাফা বেড়েছে। আলোচিত ছয় মাসে কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে মুনাফা বেড়ে ২ হাজার ৬০৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ২ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। 

মুনাফা কমা কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমার কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খাতভেদে কোম্পানিগুলোর মুনাফা ভিন্ন ভিন্ন কারণে কমেছে। বড় ঋণের কারণে কিছু কোম্পানির অর্থায়ন ব্যয় বেড়েছে। এতে মুনাফায় ভাটা পড়েছে। আবার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে সরকারি ব্যয় কম থাকায় নির্মাণ খাতের কার্যক্রম কমেছে, যার প্রভাব পড়েছে সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সিঙ্গার বাংলাদেশ ৪২ কোটি ২০ লাখ টাকা লোকসান করেছে। যদিও আগের বছরের একই সময়ের ৬৫ কোটি ৯০ লাখ টাকার চেয়ে কম। আলোচিত ছয় মাসে কোম্পানিটির বিক্রি প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ বেড়ে ১,৪১৫ কোটি টাকা হয়েছে। এতে লোকসান কিছুটা কমেছে।

সিঙ্গার বাংলাদেশের কোম্পানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ইলেকট্রনিক্স ও গৃহস্থালী পণ্যের চাহিদা প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল। এতে কোম্পানিটির মুনাফা কমেছে।

নির্মাণ খাতের মন্দার কারণে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশ ১১ কোটি ১০ লাখ টাকা লোকসান করেছে। আগের বছরের একই সময়ে কোম্পানিটি ২২ কোটি ৩০ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছিল। আলোচিত ছয় মাসে কোম্পানিটির বিক্রি ১১ শতাংশ কমায় এই লোকসানে পড়তে হয়েছে। 

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের মুনাফা আট শতাংশ কমে ২১৭ কোটি টাকা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে কোম্পানিটি ২৩৬ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। আর ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের মুনাফা ৪৮ শতাংশ কমে ১১ কোটি ৯০ লাখ টাকা হয়েছে। আগের বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে কোম্পানিটির ৩৮ কোটি ১০ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছিল। এ ছাড়া রাজস্ব আয় কমায় ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের মুনাফা শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ কমে ৪১৩ কোটি টাকা হয়েছে। আগের বছরের প্রথম ছয় মাসে যা হয়েছিল ৪১৫ কোটি টাকা।

মোবাইল ফোন খাতে গ্রামীণফোন ও রবি আজিয়াটার ফলাফলে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে রবি আজিয়াটার মুনাফা ২৯ শতাংশ বেড়ে ৪৯৫ কোটি টাকা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৮৩ কোটি টাকা। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাজস্ব বৃদ্ধি, ডেটা ব্যবহার এবং গ্রাহকসংখ্যা বাড়ায় এ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিপরীতে আলোচিত ছয় মাসে গ্রামীণফোনের মুনাফা ছয় শতাংশ কমে ১,৪২১ কোটি টাকা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে যা হয়েছিল ১,৫১৩ কোটি টাকা। কোম্পানিটির রাজস্ব আয় ২.৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় মুনাফায় এই ধাক্কা এসেছে।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাটা শু কোম্পানির (বাংলাদেশ) মুনাফা ৮৬ শতাংশ বেড়ে ৫০ কোটি ৪০ লাখ টাকা হয়েছে। আগের বছরের এইক সময়ে যা হয়েছিল ২৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। কোম্পানি বিক্রি ১০ শতাংশ বেড়ে ৫৬৮ কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ায় মুনাফায়ও এই প্রবৃদ্ধি এসেছ। ঈদের বাড়তি বিক্রি, নতুন পণ্য এবং নকশায় পরিবর্তনের কারণে গ্রাহকদের ভালো সাড়া পাওয়ায় বিক্রি বেড়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।

আলোচিত ছয় মাসে রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশের মুনাফা চার শতাংশ বেড়ে ৩০ কোটি ৪০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে যা হয়েছিল ২৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। তবে এ সময়ে কোম্পানিটির বিক্রি দুই শতাংশ কমার পরও মুনাফায় এই প্রবৃদ্ধি এসেছে।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শেয়ারে শত কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ রয়েছে সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির। একই সঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্স দীর্ঘ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করছে ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। এ বিষয়ে ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শহিদুল ইসলাম বলেন, এই পরিস্থিতির মূল কারণ ছিল দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক দুর্বলতা। মূল্যস্ফীতির কারণে কাঁচামালের দাম বেড়েছে। কিন্তু কোম্পানিগুলো সেই বাড়তি খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপাতে পারেনি। কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে চাহিদাও কমেছে।

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সামনে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কয়েক মাস আগে পরিস্থিতির উন্নতির আশা দেখা গেলেও ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং তেলের দাম বাড়লে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে, যা আগামী দিনগুলোতেও সরাসরি কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন