# জাতীয় গ্রিডে আজ যোগ হচ্ছে ১২.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস
# চার মাসে আসছে আরও ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস
# গ্যাস সরবরাহ বাড়ায় স্বস্তি আবাসিক-শিল্পে
# চার দিনে সরবরাহ বেড়েছে ২৬১ মিলিয়ন ঘনফুট
# গ্যাস সংকটের প্রভাবে বিদ্যুতে হাহাকার
দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলছে গ্যাসের ঘাটতি। এর মধ্যে বেশ কিছু দিন ধরে গ্যাস সংকটে যখন চারদিকে হাহাকার তখন একটা স্বস্তির খবর মিলছে দেশীয় গ্যাস খাত থেকে। নতুন কূপ খনন ও পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বাড়তি গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। দেশীয় উৎস থেকে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ থেকে আগামীকাল শনিবার থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ১২.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে তিতাস-২৯, ৩০ ও ৩১ এবং বাখরাবাদ-১১ কূপ থেকে আরও ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে, গত কয়েকদিনে দেশে গ্যাসের সরবরাহ কিছু বাড়ায় আবাসিক, সিএনজি ও শিল্প খাতের গ্রাহকদের ভোগান্তি কিছুটা কমেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ আগের তুলনায় বাড়ায় রান্না ও শিল্পকারখানার কাজে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
বিএনপি সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে নতুন কূপ খনন ও বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়ন কার্যক্রমের সুফল হিসেব এ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
বিজিএফসিএলের কর্মকর্তারা জানান, তিতাস-২৮ কূপ খনন কাজ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি তিতাস-২৯, ৩০ ও ৩১ এবং বাখরাবাদ-১১ কূপ খননের কাজ এগিয়ে চলছে। এসব কূপের কাজ শেষ হলে আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে মোট প্রায় সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
বিজিএফসিএলের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, বিজিএফসিএলের আওতাধীন তিতাস-২৮ নম্বর কূপ আগামীকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের পরপরই কূপটি জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। এতে আমদানি-নির্ভরতার চাপ কমিয়ে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে।
‘তিতাস ও কামতা ফিল্ডে ৪টি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খনন’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম জসীম উদ্দিন বলেন, তিতাস-২৮ নম্বর কূপের খননকাজ প্রায় এক মাস আগে শেষ হয়েছে। কূপটির গভীরতা প্রায় ১৩ হাজার ফুট। উদ্বোধনের পরপরই এটি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে।
তিনি জানান, প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিতাসসহ বেশ কয়েকটি কূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে তিতাস-২৮ নম্বর কূপ আগামীকাল উৎপাদনে যাবে। অন্য কূপগুলোর কাজও দ্রুত শেষ করে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজিএফসিএলের গভীর অনুসন্ধান গ্যাস কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব জানান, তিতাস-৩১ নম্বর গভীর অনুসন্ধান কূপের খননকাজ চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে কূপটির খনন গভীরতা প্রায় ৪ হাজার ৯২০ মিটারে পৌঁছেছে। কূপটির লক্ষ্যমাত্রা গভীরতা ৫ হাজার ৬০০ মিটার, যা প্রায় ১০০ মিটার কমবেশি হতে পারে।
তিনি বলেন, গভীরতার কারণে কূপটির খনন ও পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগছে।
কোনো ধরনের ভূতাত্ত্বিক জটিলতা দেখা না দিলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে তিতাস-৩১-এর কাজ শেষ করার আশা রয়েছে। কূপটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
মাহমুদুল নবাব জানান, তিতাস-২৯ নম্বর কূপের মূল খননকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বর্তমানে কূপটির লগিংসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রম চলছে। এসব কাজ শেষ করে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে কূপটি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। তিতাস-২৯ থেকে দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া তিতাস-৩০ নম্বর কূপের কাজও আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। কূপটি থেকে দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বিজিএফসিএল।
বিজিএফসিএলের কর্মকর্তারা জানান, তিতাস-৩১-এর কাজ শেষ হওয়ার পর বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের ১১ নম্বর গভীর কূপের খননকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। কূপটির লক্ষ্যমাত্রা গভীরতা ৪ হাজার ৫০০ মিটার, যা প্রায় ১০০ মিটার কমবেশি হতে পারে। সফলভাবে খনন ও পরীক্ষা সম্পন্ন হলে বাখরাবাদ-১১ থেকে দৈনিক প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
তিতাস-২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং বাখরাবাদ-১১ থেকে প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর সঙ্গে তিতাস-২৮ থেকে সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট যোগ হলে পাঁচটি কূপ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের মজুত প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে এর মজুত আনুমানিক দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তিতাস-৩১ একটি অনুসন্ধানমূলক কূপ হওয়ায় এর মাধ্যমে নতুন গ্যাসের মজুত আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে কূপটির মাধ্যমে আরও প্রায় দুই টিসিএফ গ্যাসের মজুত যুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ মজুদের পরিমাণ নিশ্চিত করতে কূপটির খনন শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন স্তরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষার ফল পাওয়ার পরই নতুন মজুতের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তিতাস গ্যাসক্ষেত্ত্রের ইতিহাস: দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের মোট ২৭ ভাগ উৎপাদন করে বিজিএফসিএল। তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৯, ৩০ ও ৩১ নাম্বার কূপ থেকে নতুন করে এ গ্যাস পাওয়া যাবে। এর মধ্যে ২৯ নাম্বার কূপের খনন শেষ হয়েছে। আগামী ৩ সপ্তাহের মধ্যে এই কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের আশা করছে সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া ৩১ নাম্বার কূপের খননকাজও প্রায় শেষপর্যায়ে।
১৯৬২ সালে তৎকালীন পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানি তিতাস গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। এরপর ১৯৬৮ সালে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নন্দনপুর এলাকায় গত ১৯ এপ্রিল ৩১ নাম্বার কূপের খনন শুরু হয়। এটি দেশের প্রথম ও সবচেয়ে গভীর অনুসন্ধান গ্যাস কূপ। দেশের সবচেয়ে উচ্চচাপ ও উচ্চতাপ সম্পন্ন ৩১ নাম্বার কূপটি ৫ হাজার ৬শ মিটার গভীরতায় খনন শুরু হয়। এরই মধ্যে ৪ হাজার ৯২০ মিটার পর্যন্ত খনন শেষ হয়েছে। এই কূপ এলাকায় প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত থাকার আশা সংশ্লিষ্টদের। চলতি বছরেই কূপটির খনন শেষ করে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের আশা করছে বিজিএফসিএল কর্তৃপক্ষ।
বিজিএফসিএল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে উৎপাদনে থাকা তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৩টি কূপ থেকে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে গড়ে ৩৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে তিতাস ১ নাম্বার কূপটি সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫০ মিটার গভীর পর্যন্ত খনন করা হয়েছিল। এটিই দেশের সবচেয়ে গভীর কূপ। তবে বিদ্যমান কূপগুলোতে গ্যাসের মজুত এবং চাপ কমার ফলে ক্রমশ কমছে উৎপাদন।
উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ২৯, ৩০ ও ৩১ নাম্বার কূপের খনন প্রকল্প গ্রহণ করে বিজিএফসিএল। ইতোমধ্যে ২৯ নাম্বার কূপের খনন শেষ হয়েছে। শিগগিরই ৩০ নাম্বার কূপের খনন শুরু হবে। আর ৩১ নাম্বার কূপের খনন কাজও চলতি বছরেই শেষ হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক।
সংকটের মধ্যেই বাড়ছে সরবরাহ: পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছিল। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ১৬১ কোটি এবং এলএনজি থেকে প্রায় ৯৯ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে।
এর আগে ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে। ১৫ আগস্ট টার্মিনালটি ফের চালু হওয়ার পর সরবরাহ বাড়তে শুরু করে।
এখন এলএনজি সরবরাহও ধীরে ধীরে বাড়ানো হচ্ছে। ফলে মোট গ্যাস সরবরাহ আগের অবস্থায় ফেরানোর চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী বাড়তি গ্যাসের বড় অংশ শিল্প খাতে দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতেও কিছুটা সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে, যাতে লোডশেডিং কমানো যায়।
গ্যাস সরবরাহ বাড়ায় স্বস্তি আবাসিক-শিল্পে: এদিকে, গত কয়েকদিনে দেশে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। এতে আবাসিক, সিএনজি ও শিল্প খাতের গ্রাহকদের ভোগান্তি কিছুটা কমেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ আগের তুলনায় বাড়ায় রান্না ও শিল্পকারখানার কাজে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের জন্য অপেক্ষার সময় কিছুটা কমেছে। তবে সরবরাহ বাড়লেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি থাকায় এখনো অনেক এলাকায় কম চাপ ও নির্দিষ্ট সময়ে গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় আবাসিক ও শিল্পে সরবারহে গতিও কিছুটা বেড়েছে।
শিল্প কারখানাগুলোতেও গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। এতে স্বস্তি ফিরেছে খাত সংশ্লিষ্টদের। এখন উৎপাদন কার্যক্রমও অনেকটা স্বাভাবিক গতিতে চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান গতকাল (বৃহস্পতিবার) এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গ্যাসের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গত কয়েক দিনের চেয়ে এখন সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। আর বিদ্যুৎ কিংবা জ্বালানি সংকটের কারণে কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি। জ্বালানি সংকটের এই অভিঘাত বোঝা যাবে আরও অন্তত তিন মাস পর।
তিনি বলেন, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ডাইং, ওয়াশিংসহ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। তবে সম্প্রতি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর শিল্পে গ্যাস সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং তা কার্যকর হয়েছে।
চার দিনে সরবরাহ বেড়েছে ২৬১ মিলিয়ন ঘনফুট: বাংলাদেশ তেল গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) দৈনিক গ্যাস উৎপাদন প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত চারদিনে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের মোট উৎপাদন ও পুনঃগ্যাসীকরণ মিলিয়ে দৈনিক সরবরাহ প্রায় ২৬১ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) বেড়েছে। এসময়ে স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন তুলনামূলকভাবে প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
পেট্রোবাংলার ১৩-১৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই ২৪ ঘণ্টায় দেশে মোট গ্যাস উৎপাদন ও আরএলএনজি (রিগ্যাসিফায়েড এলএনজি) সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৩৪৫ দশমিক ৩ এমএমসিএফডি। পরদিন ১৪-১৫ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৪৭৮ দশমিক ১ এমএমসিএফডি। ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর আরও বেড়ে হয় ২ হাজার ৬০৪ এমএমসিএফডি। সর্বশেষ ১৬-১৭ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে মোট সরবরাহ ২ হাজার ৬০৬ দশমিক ১ এমএমসিএফডি হয়েছে। অর্থাৎ, ১৩-১৪ সেপ্টেম্বরের তুলনায় ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২৬০ দশমিক ৮ এমএমসিএফডি বা প্রায় ১১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে।
তবে চারদিনের এই বৃদ্ধির প্রধান উৎস স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র নয়, তা এসেছে এলএনজি থেকে। ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর আরএলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ ছিল ৭৩১ দশমিক ৬ এমএমসিএফডি। ১৪-১৫ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে ৮৫৮ দশমিক ৪ এমএমসিএফডি, ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর ৯৮২ দশমিক ৬ এমএমসিএফডি এবং ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর ৯৮২ দশমিক ৯ এমএমসিএফডি হয়েছে। চারদিনে এলএনজি থেকে সরবরাহ বেড়েছে ২৫১ দশমিক ৩ এমএমসিএফডি, যা মোট বৃদ্ধির প্রায় ৯৬ শতাংশ।
অন্যদিকে, স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৬১৩ দশমিক ৭ এমএমসিএফডি থেকে ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৬২৩ দশমিক ২ এমএমসিএফডি হয়েছে। অর্থাৎ, স্থানীয় উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৫ এমএমসিএফডি।
গ্যাস সংকটের প্রভাবে বিদ্যুতে হাহাকার: দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে। এসব এলএনজি আমদানির প্রায় ৯৫ শতাংশই একসময় কাতার থেকে আসত। কাতার থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় এখন বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
চলতি সপ্তাহে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, শিল্পের প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যাচ্ছে এবং উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও প্রভাব পড়েছে।
পোশাকশিল্পের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)- এর এক জরিপে দেখা গেছে, আগস্টের শেষ দিক থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ৫৫ শতাংশ নিট পোশাক কারখানার ক্রেতারা অর্ডার বাতিল বা কমিয়ে দিয়েছেন। আর ৭৮ শতাংশ কারখানা আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
একটি কারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদনের মাঝপথে বয়লার নষ্ট হয়ে যায়। এই কারখানার মালিক আলভি ইসলামকে চীন থেকে কাপড় সংগ্রহ করতে হয়। উৎপাদনে দেরি হওয়ায় এক ক্রেতা ৫০ হাজার পিসের অর্ডার কমিয়ে ৪০ হাজার পিস করেন। জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদনে দেরি হওয়ায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বিমানপথে পণ্য পাঠাতে হয়েছে।
পোশাকশিল্পের নির্বাহী ফজলে শামীম এহসান জানান, ফ্রান্সের এক ক্রেতার কাছে হুডি জ্যাকেট পাঠাতে তাদের বিমান পরিবহনে ৫০ হাজার ডলার খরচ হয়েছে। হাসপাতালও এই সংকটের বাইরে নয়। সিলেটের একটি হাসপাতালে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। জেনারেটরের সাহায্যে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) চালু রাখা গেলেও ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা সবসময় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গরমের মধ্যে ঘিঞ্জি কক্ষে রোগীদের থাকতে হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবৈতনিক অধ্যাপক, ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম গণমাধ্যমকে বলেন, গ্যাস সংকট আজকের সমস্যা নয়, এটি বহু পুরানো সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলনের কার্যক্রম বাড়াতে হবে। যদিও কার্যক্রমে আমাদের দুর্বলতা আছে। এজন্য আমরা বারবার সংকটের মধ্যে পড়ি। আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশি কোম্পানিগুলোকেও কাজে থাকতে হবে। সামগ্রিকভাবে এ কাজগুলো করতে পারলে সংকট কাটবে।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

