অনিয়ম খুঁজে সময় নষ্ট করতে চাই না : গভর্নর
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৮:২৪
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, ‘কী অনিয়ম হয়েছে, তা সবাই জানি। কে কাকে সহায়তা করেছে, তা খুঁজে সময় নষ্ট করতে চাই না।’ তাকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও জানিয়েছেন।
সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতি ঘোষণা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ ও নীতি পরিবর্তন করে বিভিন্ন গ্রুপকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না- সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ব্যাংক খাতের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি জোরদার করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাতে ভবিষ্যতে খারাপ ঋণ আর বিতরণ না হয়। অনিয়মের ঋণ উদ্ধারে দেশি-বিদেশি সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। পাচার করা অর্থ উদ্ধারে কাজ চলছে।’
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নরের কাছে প্রশ্ন ছিল, এস আলমসহ ১০টি শিল্প গ্রুপ ও শেখ পরিবার নিয়ে যৌথ তদন্ত হচ্ছে, তারা আসলে কত টাকা নিয়েছে? জবাবে গভর্নর বলেন, ‘প্রাথমিক হিসাবে ধারণা করা হয়, এস আলম একাই ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসা করলেও বলতে পারবে না, কত টাকা নিয়েছে। জাভেদ (সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী) বিদেশে সাড়ে ৩০০ বাড়ি কিনেছেন। এত বাড়ির ঠিকানা তিনি নিজেও দিতে পারবেন না।’
সংকটে পড়া ব্যাংকগুলো সম্পর্কে গভর্নর বলেন, ‘তাদের তারল্য–সহায়তা দেওয়া হয়েছে, প্রয়োজনে আরও দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে ইসলামী ব্যাংক ও ইউসিবি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তাদের আর সহায়তার প্রয়োজন হবে না। আমানতকারীদের স্বার্থ দেখা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজ, সেটা করা হচ্ছে। এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে সংস্কার করা হবে, এর ফল পেতে সময় লাগবে। সব প্রক্রিয়া শেষে পুরো ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী ভিত্তি দিতে তিন-চার বছর সময় লাগবে।’
শ্রীলঙ্কা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও বাংলাদেশ কেন পারছে না, জানতে চাইলে গভর্নর বলেন, ‘শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। খাবার ও তেলের জন্য সেখানে লাইন পড়েছিল। তাদের মূল্যস্ফীত ২০০ পারসেন্ট পর্যন্ত চলে গিয়েছে। যেখানে আমাদের এখানে ১২-১৩ পারসেন্ট। তাদের আইএমএফের ঋণ নির্ভরতা ছিল। বাংলাদেশ সেই পরিস্থিতিতে পড়েনি। যে কারণে আমাদের আইএমএফের ঋণের খুব বেশি প্রয়েজন এখনো পড়েনি। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা চলে না। বাংলাদেশের চলতি হিসাব ও আর্থিক হিসাব ইতিবাচক। বিনিময় হার স্থিতিশীল, রিজার্ভও বাড়ছে।’
মুদ্রানীতির কারণে বিনিয়োগ কমে কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, ‘আমি আগে থেকেই বলে আসছি, ২০২৪ ও ২০২৫ সাল প্রবৃদ্ধি অর্জনের বছর নয়। এই দুই বছর অর্থনীতি মেরামত করার বছর। রাজনৈতিক অস্থিরতা রয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে এমনিতেও বিনিয়োগ হবে না। সবকিছু মুদ্রানীতি দিয়ে হবে না। আমাদের প্রধান লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কার উদ্যোগে কেউ বাধা দিচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, ‘কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি বাধা দিচ্ছে না। তবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমার বিরুদ্ধেও তারা কাজ করছে।’
ডলারের দাম কবে বাজারভিত্তিক হবে, জানতে চাইলে গভর্নর বলেন, ‘এখনো সে সুসময় আসেনি। এখনো ডলারের দাম বাড়ানোর জন্য কিছু মধ্যস্বত্বভোগী কাজ করে যাচ্ছে। তারা প্রবাসীদের ডলার কিনে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমরা ব্যাংকগুলোকে বলে দিয়েছি তাদের থেকে ডলার না কেনার জন্য। ডলারের দাম মধ্যস্বত্বভোগীরা ঠিক করতে পারে না, এটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঠিক করবে।’
ব্যাংক পরিচালকদের বিষয়ে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘স্বতন্ত্র পরিচালকদের একটা তালিকা করা হবে। সেখান থেকে পরিচালক নিয়োগ করতে হবে। আমি মনে করি, অর্ধেক পরিচালক স্বতন্ত্র হওয়া উচিত। ২ শতাংশ শেয়ার দিয়ে পরিচালক হওয়া বন্ধ ও পরিচালকদের মেয়াদ কমিয়ে আনা দরকার। এ জন্য আমরা আইন পরিবর্তনের প্রস্তাব করব।’
এএইচএস/এমজে

