প্রাথমিক শিক্ষকদের ফাউন্ডেশন ট্রেনিং লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি
মো. কামরুজ্জামান
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:২৪
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ফাউন্ডেশন ট্রেনিং হিসেবে পিটিআইতে দশ মাসব্যাপী বিটিপিটি প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। এ প্রশিক্ষণের দশম মাসে ১৯টি সাব মডিউলের ক্ষেত্রে ৫টি মডিউল হিসেবে পাঁচটি লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে প্রস্তুতি হিসেবে লিখিত পরীক্ষা- ১ এর প্রশ্নগুলোর সম্ভাব্য উত্তর দেয়া হলো।
উপমডিউল-১.১: শিক্ষাকতায় পেশাদারিত্ব ও অঙ্গীকার
১। সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন (৩টি হতে যে কোন ২টি)
(ক) ‘শিক্ষকতা পেশায় পেশাগত সম্পর্ক স্থাপন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়’-ব্যাখ্যা করুন। উত্তর: শিক্ষকতা পেশায় পেশাগত সম্পর্ক স্থাপন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কারণ এটি একটি কার্যকর শিখন পরিবেশ নিশ্চিত করে। এই সম্পর্কগুলো নিম্নরূপ:
* শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ক: শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন, তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বোঝা এবং পাঠদানে আগ্রহী করে তোলার জন্য ইতিবাচক সম্পর্ক অপরিহার্য।
সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক: পারস্পরিক সহযোগিতা, অভিজ্ঞতা বিনিময়, পাঠ পরিকল্পনা ও মূল্যায়নে সহায়তা এবং একটি সহযোগিতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি (collaborative culture) গড়ে তোলার জন্য এ সম্পর্ক জরুরি।
* অভিভাবক ও কমিউনিটির সঙ্গে সম্পর্ক: শিক্ষার্থীর সার্বিক উন্নয়নে (যেমন: ঝরে পড়া রোধ, নিয়মিত উপস্থিতি) পরিবার ও সমাজের সমর্থন আদায়ের জন্য পেশাগত সুসম্পর্ক অপরিহার্য।
(খ) পেশাগত উন্নয়নে কর্মসহায়ক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা ৪টি বাক্যে লিখুন। উত্তর: ১. কর্মসহায়ক গবেষণা শিক্ষককে তার নিজ শ্রেণিকক্ষের বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করতে ও তার কারণ অনুসন্ধানে সহায়তা করে।
২. এটি শিক্ষককে সমস্যা সমাধানে নতুন নতুন কৌশল বা পদ্ধতি প্রয়োগ করতে এবং তার কার্যকারিতা যাচাই করতে উৎসাহিত করে।
৩. এই গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষক একজন প্রতিফলনমূলক অনুশীলক (reflective practitioner) হয়ে ওঠেন, যা তার নিজস্ব শিখন-শেখানো প্রক্রিয়ার দুর্বলতাগুলো দূর করে।
৪. ফলস্বরূপ, শিক্ষকের ক্রমাগত পেশাগত উন্নয়ন ঘটে এবং শ্রেণিকক্ষের শিখনফল উন্নত হয়।
(গ) TPACK মডেল বলতে কী বোঝায় লিখুন।
উত্তর: TPACK মডেল হলো Technological Pedagogical Content Knowledge (প্রযুক্তিগত শিক্ষাবিজ্ঞান বিষয়ক জ্ঞান)। এই মডেলটি শিক্ষকতার জন্য প্রয়োজনীয় তিন ধরনের জ্ঞানের সফল একীভূতকরণকে বোঝায়। এর মূল উপাদান তিনটি: ১. বিষয়জ্ঞান (Content Knowledge - CK): শিক্ষক যে বিষয়টি পড়াবেন সে বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান। ২. শিক্ষাবিজ্ঞান (Pedagogical Knowledge - PK): কীভাবে শিক্ষার্থীদের শেখাতে হয়, শিখন পদ্ধতি, কৌশল এবং শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত জ্ঞান। ৩. প্রযুক্তিজ্ঞান (Technology Knowledge - TK): শিক্ষামূলক প্রযুক্তি (যেমন: কম্পিউটার, মাল্টিমিডিয়া, ইন্টারনেট) ব্যবহারের দক্ষতা।
TPACK মডেলের মূল কথা হলো, কার্যকর শিক্ষাদানের জন্য এই তিনটি জ্ঞানকে বিচ্ছিন্নভাবে জানাই যথেষ্ট নয়, বরং নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু পড়ানোর জন্য সঠিক শিক্ষণ পদ্ধতির সঙ্গে সঠিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানোর জ্ঞান থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
২। বিস্তৃত উত্তর প্রশ্ন (৩টি হতে যে কোন ২টি)
(ক) পেশাগত দায়িত্ব পালনে সহমর্মিতা অনুশীলনে বিদ্যালয়ে একজন সহকারী শিক্ষক হিসেবে আপনার করণীয়সমূহ বর্ণনা করুন। উত্তর: একজন সহকারী শিক্ষক হিসেবে পেশাগত দায়িত্বে সহমর্মিতা (empathy) অনুশীলন একটি অন্যতম প্রধান মানবিক ও পেশাগত গুণ। আমার করণীয়গুলো নিম্নরূপ:
শিক্ষার্থীদের প্রতি সহমর্মিতা:
- প্রতিটি শিক্ষার্থীর পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝার চেষ্টা করা।
- শিখনে পিছিয়ে পড়া বা ধীরগতির শিক্ষার্থীদের প্রতি ধৈর্যশীল হওয়া এবং তাদের প্রতি আলাদাভাবে নজর দেওয়া।
- শিক্ষার্থীর ভুলগুলোকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে, ভয়ভীতি বা তিরস্কার না করে, তা সংশোধনে আন্তরিকভাবে সহায়তা করা।
- শিক্ষার্থীদের আবেগীয় চাহিদাগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া এবং তাদের কথা মন দিয়ে শোনা।
সহকর্মীদের প্রতি সহমর্মিতা:
- সহকর্মীদের ব্যক্তিগত বা পেশাগত কোনো সমস্যায় তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং মানসিক সমর্থন জোগানো।
- কারও পাঠদান বা অন্য কোনো পেশাগত দুর্বলতা দেখলে তা নিয়ে উপহাস না করে, একান্তে সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে আলোচনা করা।
-বিদ্যালয়ের কোনো অতিরিক্ত কাজে বা সহকর্মীর বিপদে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া।
অভিভাবক ও অংশীজনদের প্রতি সহমর্মিতা:
-অভিভাবক যখন কোনো অভিযোগ বা মতামত নিয়ে আসেন, তখন তা গুরুত্ব দিয়ে শোনা এবং তাদের অবস্থান থেকে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা।
বিদ্যালয়ের কার্যক্রমে অংশীজনদের (যেমন: এসএমসি সদস্য) মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাদের সম্পৃক্ততাকে উৎসাহিত করা।
(খ) প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে কর্মক্ষেত্রে শিষ্টাচার বজায় রাখতে আপনার বর্জনীয় কাজসমূহ বিস্তারিত লিখুন।
উত্তর : প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, বিশেষত একজন শিক্ষক হিসেবে, কর্মক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মানের শিষ্টাচার বজায় রাখা আবশ্যক। এ জন্য আমার বর্জনীয় কাজগুলো হলো:
১. অশোভন আচরণ: সহকর্মী, শিক্ষার্থী, অভিভাবক বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই রূঢ়, অশালীন বা অসম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না।
২. পক্ষপাতিত্ব ও বৈষম্য: ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ, সামাজিক বা অর্থনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী বা সহকর্মীদের প্রতি যেকোনো ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ বা পক্ষপাতিত্ব সম্পূর্ণ বর্জনীয়।
৩. গোপনীয়তা লঙ্ঘন : শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য, পরীক্ষার খাতা বা দাপ্তরিক গোপনীয় কোনো বিষয় অননুমোদিত ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করা যাবে না।
৪. অফিস সময়ের অপব্যবহার : নির্ধারিত অফিস সময়ে ব্যক্তিগত কাজে (যেমন: মোবাইল ফোনে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা, সোশ্যাল মিডিয়া ব্রাউজ করা, ব্যক্তিগত ব্যবসা পরিচালনা) লিপ্ত হওয়া বর্জনীয়।
৫. ঊর্ধ্বতনের অবাধ্যতা: ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈধ ও আইনসঙ্গত নির্দেশ অমান্য করা বা তাদের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা শিষ্টাচারবিরোধী।
৬. সহকর্মীদের সঙ্গে দ্ব›দ্ব: সহকর্মীদের নামে গুজব ছড়ানো, দলাদলি করা বা তাদের কাজে অহেতুক বাধা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৭. নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কর্মস্থলে আসা: যেকোনো ধরনের মাদক বা নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে বিদ্যালয়ে আসা সম্পূর্ণ বর্জনীয়।
৮. আর্থিক অস্বচ্ছতা: বিদ্যালয়ের অর্থ বা সম্পদ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা বা যেকোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনে অস্বচ্ছতার আশ্রয় নেওয়া যাবে না।
উপ-মডিউল-১.২: সরকারি চাকুরি আইন ও বিধিবিধান
৩। সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন (৪টি হতে যেকোন ৩টি)
(ক) নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার ৪টি কারণ উল্লেখ করুন। উত্তর: নৈমিত্তিক ছুটি (Casual Leave) মূলত আকস্মিক ব্যক্তিগত প্রয়োজনে দেওয়া হয়।
এর ৪টি কারণ হলো:
১. নিজের বা পরিবারের কোনো সদস্যের হঠাৎ অসুস্থতা।
২. পরিবারের কোনো সদস্যের বা নিকটাত্মীয়ের মৃত্যু।
৩. জরুরি ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো অনুষ্ঠান (যেমন: বিবাহ) যাতে উপস্থিতি আবশ্যক।
৪. জরুরি ব্যক্তিগত কাজ (যেমন: ব্যাংকিং, জমির দলিল সংক্রান্ত কাজ) যা অফিস সময়ের বাইরে করা সম্ভব নয়।
(খ) জনাব মিজান... একটি ফার্মেসী চালু করেছেন। ... তিনি এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন কি? বিধিমালার আলোকে ব্যাখ্যা করুন। উত্তর: না, ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ অনুযায়ী জনাব মিজান সরকারের পূর্বানুমতি ব্যতীত এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন না।
লেখক : সুপার, ঢাকা পিটিআই।
বিকেপি/এমবি

