শিক্ষা সংস্কার প্রস্তাবনা-১১
কওমি মাদরাসায় আরবি এবং কিছু প্রস্তাবনা
লাবীব আব্দুল্লাহ
প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৫০
কওমি মাদরাসার অধিকাংশ পাঠ্য পুস্তক আরবি ভাষায়। আরবি ব্যকরণের কিতাব হেদায়েতুন্নাহুর বয়স সাত শত বছর। কাফিয়ার বয়স আট শত বছর। নাহবেমীর কিতাবটি ফার্সি ভাষায় লিখিত আরবির ব্যকরণ। কিছুদিন আগেও নাহবেমীরের প্রথম তরজমা উর্দুতে করে বাংলায় বুঝিয়ে দেওয়া হতো। এখন মাওলানা নাসীম আরাফাত রচিত সহজে নাহব শিখব (আননাহু আল মুয়াচ্ছার) এবং মাদানী নেসাবে এসো নাহব শিখি পড়ানো হয়।
কাফিয়া শরহে জামি তাদাখুল জামাত। অনেক মাদরাসা থেকে কঠিনের কথা বলে বিদায় শরহে জামি। নাহবেমীর, হেদায়াতুন্নাহু, কাফিয়া, শরহে জামি পড়েও অধিকাংশ তালেবে ইলম নাহুতে দুর্বল থাকে। যোল প্রকার ধরতে পারে না। পারে না সঠিক প্রয়োগ মারফুআত, মানসুবাত ও মাজরুরাতের। নানা কারণ আছে। কিতাবদুলোতে "ইন্না যায়দান কায়িমুন" দারাবা জায়েদুন আমরান জাতীয় উদাহরণ ছাড়া বেশী কোনো উদাহরণ নেই। আরবি নস এনে নিয়মের প্রয়োগ দেখানো হয়নি। এবং সাত আট শত বছরের আগের আরবি বাক্যের জটিল ও সংক্ষিপ্ত বাক্য ব্যবহারের কারণে তালেবে ইলমরা কম বোঝে। তাছাড়া আরবি আদবের কিতাবের নাম যা পড়ানো হয় তা আরবি নাছব সরফের নিয়ামবলী প্রয়োগ করে রচিত হয়নি। কিছু নিয়মের প্রয়োগ থাকলেও তার ধারাবাহিতা নেই।
নিচের কিতাবের সাথে উপরের ক্লাসের কিতাবের কোনো সামঞ্জস্য নেই। যেমন বাকুরা পড়ানো হয় মিযান জামাতে। অর্ধেক উর্দু অর্ধেক আরবি। এটি আরবি আদবের কিছুই নেই। নাহবেমীরে রওযাতুল আদব। এটিও উর্দু ও আরবি মিশ্রিত। এটি বাংলাভাষী তালেবে ইলমের জন্য রচিত নয়। উপযোগীও নয়। আদবের খণ্ডিত কিছু বাক্য রয়েছে শুধ। নাফহাতুল আরব, মাকামাতে হারিরীতে নাহব সরফের কোনো নিয়ম প্রয়োগ দেখানো হয়নি। গল্প সংকলন নফহাতে। মাকামাতে কঠিন শব্দের ব্যবহার যা আধুনিক আরবি সাহিত্যে ব্যবহার হয় না মাকামা স্টাইল। কঠিনের কারণে দেওয়ানে মুতানাব্বি, দেওয়ানে হামাছা ও সাবই মুআল্লাকা বাদ সিলেবাস থেকে। আরবি কবিতা এখন পড়ানোই হয় না। কাসিদায়ে বুদার মতো কিতাবও পাঠ্য নেই। কোনো কোনো মাদরাসায় থাকতে পারে সেগুলো সিলেট বা চট্টগ্রামে।
মাদানী নেসাবের তৃতীয় বর্ষে আলকিরাআতুর রাশেদা পড়ানো হয়। এটি আরবি সাহিত্যের কিশোর উপযোগী কিতাব। মুখতারাত মিনাল আদাব পাঠ্য আছে নামে মাত্র। পড়ানোর যোগ্য শিক্ষকের অভাব। কঠিনেপ কারণে এখনো নোট বের হয় নাই। নোট বের হলে সেটিও পাঠ্য হবে এবং নোট দেখে দেখে আরবি সাহিত্য পড়ানো হবে। কওমি মাদরাসার আরবি সাহিত্যের দুর্দশার কথা অনেকেই খোঁজ রাখেন না। মাদানী নেসাবে এসো আরবি শিখির পর আদবের নিজস্ব কোনো কিতাব নেই। এটি প্রাথমিক স্তরের কিতাব। আরবি সাহিত্যের ইতিহাসের কোনো কিতাব পড়ানো হয় না। আধুনিক সাহিত্যও পড়ানো হয় না। প্রাচীন আরবি সাহিত্যের কোনো কোনো কিতাব পড়ানো হয়।
নাহবেমীর, হেদায়াতুন্নাহু, কাফিয়া, শরহে জামি পড়ানো হয় তাকরীর ও ইবারত হল করে করে। বাকুরা, রওযা, নফহাতুল আরব, লামিয়াতুল মুজিজা, কালউবী, মাকামাত পড়ানো হয় শব্দের তাহকীক করে করে। অধিকাংশ তালেবে ইলমের আবার আরবি
অভিধান নেই। উস্তায তাহকীক বলে দেন এতে তালেবে ইলম অলস হয়। দরসে উস্তায বক্তা, তালেবে ইলম শ্রোতা। নিদ্রা ও তন্দ্রা মামুলি বিষয়।
আরবি সাহিত্যের দরসগুলোতে আরবি বলা, আরবি শোনা এবং আরবি লেখার বিশেষ কোনো আয়োজন নেই। নেই অডিও ভিডিও কোনো মাধ্যম। শুধু আরবি বাক্যের তরজমা বলে দিলে কি আরবি শিক্ষা হবে?
দুই. আলিয়া মাদরাসার প্রথম শ্রেণি থেকে দাখেল পর্যন্ত আরবি সাহিত্যর কিতাবগুলো উন্নত। আরব দেশর কিতাবের সাথে মিল রেখে রচিত। কমিউনিকিটিভ আরবি। দাখেল পর্যন্ত কিতাবগুলো যদি কওমি মাদরাসায় থাকতো তাহলে আরবি পড়ার মান বাড়তো। আলিয়ায় আরবির কী অবস্থা তা নিয়ো কথা কম বলা ভালো। নোট গাইড, অযোগ্য শিক্ষকের কারণে যা হবার তাই হয়েছে আরবি সাহিত্য পড়ানের ক্ষেত্রে। কিছু আলিয়া মাদরাসা ব্যতিক্রম তারা আরবিতে অনেক অগ্রসর।
তিন. আরবি জীবন্ত ভাষা। কোরআন ও হাদীসের ভাষা। এই ভাষায় দুর্বল থাকলে ইলমে দূর্বল নিশ্চিত। এই ভাষায় শত শত পেপার বের হচ্ছে। বের হচ্ছে ম্যাগাজিন, মাজাল্লা। প্রতিদিন আরবি ভাষায় শত শত প্রকাশনা হচ্ছে আরব বিশ্বে।
টকশো হচ্ছে আরবিতে। টিভি নিউজ দেখার কত আয়োজন। আরবিতে শত শত শিক্ষামূলক কার্টুন বানানো হয়েছে।
ঐতিহাসিক চরিত্রকে ধারণ করে মাসরাহিয়্যা তৈয়ার করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের মাদরাসার মাকতাবাতে এইগুলো শূণ্য। বিচ্ছিন্ন আমরা আরব জগৎ থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের ইলমী কাজ থেকে। আরব বিশ্বের স্কুল কলেজের জন্য রচিত আরবি সাহিত্যের কিতাবগুলো নেটে রয়েছে। নেটে রয়েছে আরবি শিক্ষার কত ধরণের আয়োজন। আমরা এগুলোকে নীরবে বর্জণ করি। সব বর্জণ করলে অর্জনের থলি কিন্তু শূণ্য থাকে।
প্রস্তাবনা:
(১) কওমি মাদরাসার সকল শ্রেণিতে আরবিতে কথা বলার জন্য দরসের অন্তর্ভুক্ত করে একটি ঘণ্টা বরাদ্দ করা হোক। তালেবে ইলমরা এই ঘণ্টায় অরবী ছাড়া অন্যকোনো কথা বলবে না।
(২) আরবিতে লেখালেখির জন্য মাধ্যমিক স্তরের শ্রেণিতে ইনশা বা আরবিতে লেখালেখির জন্য একটি ঘণ্টা দরসের অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
(৩) প্রতিটি মাদরাসায় আরবি ভাষা ও সাহিত্যর পৃথক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হোক।
(৪) আরব দেশ থেকে প্রকাশিত পত্রপত্রিকা, বইপত্র পড়ার আয়োজন করা হোক।
(৫) আরব দেশ থেকে অতিথি শিক্ষক এনে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতির ওপর কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থ্য করা হোক।
(৬) নবীণ আরবি লেখকদের লেখা আরবি কিতাবগুলো প্রতিটি মাদরাসায় সহপাঠ হিসেবে পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক। (৭) প্রতিটি শ্রেণির পক্ষ থেকে বছর শেষে আরবি প্রকাশনার আয়োজন করা হোক।
(৮) উলুমূল আরাবিয়ার দক্ষ শিক্ষক তৈয়ারের উদ্দেশ্যে ছুটি ও বেতনসহ মাদরাসার পক্ষ থেকে আরব দেশে শিক্ষক পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।
(৯) কওমির প্রতিটি শ্রেণির জন্য ছাত্রদের বয়স ও যোগ্যতা বিবেচনা করে একটি আরবি ভাষা ও সাহিত্যের সিরিজ রচনা করা হোক। (১০) মাদরাসার দাফতরিক ভাষা হোক আরবি।
লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক ও পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

