মাদরাসার শিক্ষার্থীদের শাসন করবেন যেভাবে
হাফেজ মাওলানা ক্বারী মেহেদী হাসান
প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:৩৩
কওমি মাদরাসা মানুষ গড়ার কারিগর। এখানে মাদরাসার পরিবেশে শিক্ষার্থীদের শাসন করার ক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতির একটি সুন্দর সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। যেহেতু মাদরাসায় শিক্ষার্থীরা অনেক সময় আবাসিক (বোর্ডিং) থাকে। তাই শিক্ষকদের ভূমিকা কেবল শিক্ষকের নয়, বরং একজন অভিভাবক বা মুরুব্বির মতো হওয়া উচিত।
১. নববী (সা.) আদর্শ অনুসরণ করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি কখনো কাউকে মারধর করেননি।
স্নেহ ও মমতা: শাসনের আগে ছাত্রদের সাথে মহব্বত বা স্নেহের সম্পর্ক তৈরি করুন। ছাত্র যখন অনুভব করবে যে উস্তাদ তাকে ভালোবাসেন, তখন উস্তাদের সামান্য অসন্তুষ্টিই তার কাছে বড় শাস্তি মনে হবে।
ধৈর্য ধারণ: ছাত্ররা ভুল করবেই, তাদের বারবার ক্ষমা করা এবং ধৈর্যের সাথে সংশোধন করা সুন্নাহর অংশ।
২. শারীরিক প্রহার থেকে বিরত থাকা
একসময় মাদরাসায় বেত ব্যবহারের প্রচলন থাকলেও বর্তমান যুগে এটি সম্পূর্ণ অনুচিত এবং অনেক ক্ষেত্রে আইনত নিষিদ্ধ।
ক্ষতিকর দিক: অতিরিক্ত মারধর করলে ছাত্রের মন থেকে উস্তাদের প্রতি শ্রদ্ধা চলে যায় এবং সে বেয়াদব বা জেদি হয়ে ওঠে।
বিকল্প পদ্ধতি: শারীরিক কষ্টের বদলে তাকে পড়াশোনার অতিরিক্ত কাজ (ঐড়সবড়িৎশ) দেওয়া বা কিছু সময়ের জন্য কথা বলা বন্ধ রাখার মতো মানসিক শাসন বেশি কার্যকর।
৩. নসিহত ও ব্যক্তিগত পরামর্শ
মাদরাসার ছাত্ররা সাধারণত দ্বীনি পরিবেশে থাকে, তাই তাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় ও আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া খুব কার্যকর।
একান্তে বোঝানো: সবার সামনে অপমান না করে আলাদাভাবে ডেকে নিয়ে তার ভুলের ধর্মীয় ও নৈতিক ক্ষতিগুলো বুঝিয়ে বলুন।
তাকওয়ার শিক্ষা: তাকে বোঝান যে, সে একজন দ্বীনি তলেবে ইলম (জ্ঞানের অন্বেষণকারী), তাই তার আচরণ অন্যদের চেয়ে উন্নত হওয়া উচিত।
৪. আদব ও শিষ্টাচার (তারবিয়াহ)
শুধু কিতাব পড়ানো নয়, বরং আদব শেখানোই মাদরাসার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
রুটিন মেনে চলা: নামাজের জামাত, তিলাওয়াত এবং খাবারের আদব পালনে কঠোরতা না করে অভ্যাসে পরিণত করতে উৎসাহিত করুন।
উদাহরণ হওয়া: শিক্ষক নিজে যদি আমল ও আখলাকে আদর্শ হন, তবে ছাত্ররা তাকে দেখে আপনাআপনিই সংশোধিত হবে।
৫. অভিভাবকের সাথে যোগাযোগ
যদি কোনো ছাত্র বারবার ভুল করে বা অবাধ্য হয়, তবে নিজে কঠোর শাসন না করে তার অভিভাবককে বিষয়টি জানান। মাদরাসার শৃঙ্খলা কমিটির মাধ্যমে নিয়মমাফিকভাবে পদক্ষেপ নিন।
৬. বৈষম্য না করা
সব ছাত্রকে সমান চোখে দেখা উচিত। কোনো বিশেষ ছাত্রের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বা কারো প্রতি অতিরিক্ত কঠোরতা ছাত্রদের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ছাত্র মেধাবী হোক বা না হোক, প্রতিটি ছাত্রই কিন্তু ছাত্র। সবাইকে আপন মনে করতে হবে। ভালোদেরকে বেশি আদর করা আর দুষ্টদের প্রতি সর্বদা রাগ দেখানো উচিত নহে।
প্রতিটি শিক্ষার্থীকে নিয়েই বড় বড় স্বপ্ন দেখে তার পরিবার। সুতরাং প্রত্যেকের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সচেষ্ট হওয়া।
শিক্ষকের জন্য একটি বিশেষ পরামর্শ:
যখন কোনো ছাত্রের ওপর রাগ আসবে, তখন ভাবুন যে সে আপনার কাছে একটি আমানত। শাসনের উদ্দেশ্য যেন নিজের রাগ মেটানো না হয়, বরং তার ‘ইসলাহ’ বা সংশোধন হয়।
লেখক : চেয়ারম্যান, মাশকুল কোরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক: অনলাইন হিফজ মাদরাসা

