Logo

শিক্ষা

ইসলামী জ্ঞান বিস্তারে আব্বাসীয় খলিফা মানসুর

Icon

সুলতান মাহমুদ সরকার

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৭

ইসলামী জ্ঞান বিস্তারে আব্বাসীয় খলিফা মানসুর

ইসলাম এমন এক জীবন ব্যবস্থার নাম, যার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে জ্ঞান, বোধ ও বিবেকের ওপর। মানবজাতিকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে আলোর পথে আহ্বান জানানোই ইসলামের মৌলিক লক্ষ্য। পবিত্র কোরআনের প্রথম অবতীর্ণ আয়াতেই আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন- “পড়ো, তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন”। এই ‘পড়ো’ শব্দটি কেবল পাঠ করার নির্দেশ নয়, বরং জ্ঞানার্জন, অনুসন্ধান ও উপলব্ধির এক চিরন্তন আহ্বান। একইভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরজ”। অর্থাৎ ইসলাম শুধু ইবাদতের ধর্ম নয়, বরং এটি একটি জ্ঞানভিত্তিক সভ্যতার রূপরেখা।

এই জ্ঞানচেতনার হাত ধরেই ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে মুসলমানরা জ্ঞানচর্চাকে ইবাদতের মর্যাদায় উন্নীত করেন। নবী করিম (সা.)-এর যুগে মসজিদ ছিল কেবল নামাজের স্থান নয়, বরং তা ছিল শিক্ষা ও জ্ঞানের কেন্দ্র। সাহাবায়ে কেরাম কোরআনের আয়াত সংরক্ষণ, হাদিস লিপিবদ্ধকরণ ও তা প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। এরপর খেলাফায়ে রাশেদিনের যুগে ইসলামী জ্ঞান একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। কোরআন সংকলন, ফিকহি চিন্তার বিকাশ এবং প্রশাসনিক জ্ঞানচর্চার সূচনা হয় এই সময়েই।

উমাইয়া যুগে ইসলামী রাষ্ট্র বিস্তৃত হলেও জ্ঞানচর্চা তখনো পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। তবে ভাষা, ইতিহাস ও প্রশাসনিক জ্ঞান তখন বিকাশ লাভ করতে থাকে। প্রকৃত অর্থে ইসলামী জ্ঞানচর্চার সোনালি অধ্যায়ের সূচনা ঘটে আব্বাসীয় আমলে, বিশেষ করে খলিফা আবু জাফর আল-মানসুরের শাসনামলে। ইতিহাসে তিনি শুধু একজন দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেই নন, বরং জ্ঞানবান্ধব শাসক হিসেবেও চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর এমন এক সময় ক্ষমতায় আসেন, যখন মুসলিম বিশ্ব রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মতাদর্শিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কেবল সামরিক শক্তিতে নয়, বরং জ্ঞান ও চিন্তার উৎকর্ষে গড়ে ওঠে। তাই রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত করতে তিনি জ্ঞানচর্চাকে অগ্রাধিকার দেন। তাঁর হাত ধরেই আব্বাসীয় খেলাফত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সাম্রাজ্যে রূপ নিতে শুরু করে।

মানসুরের অন্যতম যুগান্তকারী অবদান ছিল জ্ঞানকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নিয়ে আসা। তিনি আলেম, ফকিহ, মুহাদ্দিস, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের বিশেষ মর্যাদা দেন। রাজদরবারে জ্ঞানীদের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক বিষয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, আলেমরা রাষ্ট্রের বিবেক। এই চিন্তা থেকেই তাঁর শাসনামলে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জ্ঞানীরা বাগদাদে সমবেত হতে শুরু করেন।

খলিফা মানসুরের সবচেয়ে স্মরণীয় কীর্তি হলো বাগদাদ নগরীর প্রতিষ্ঠা। এই শহর শুধু একটি প্রশাসনিক রাজধানী ছিল না; এটি হয়ে ওঠে ইসলামী জ্ঞান ও সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র। বাগদাদ অচিরেই এমন এক নগরীতে পরিণত হয়, যেখানে ধর্মীয় জ্ঞান, দর্শন, গণিত, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ইতিহাস একসঙ্গে বিকশিত হতে থাকে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে পাণ্ডুলিপি, বই ও জ্ঞানসাধকরা এখানে সমবেত হন।

মানসুরের সময়েই অনুবাদ আন্দোলনের সূচনা ঘটে। গ্রিক, পারসিক ও ভারতীয় জ্ঞানভাণ্ডার আরবি ভাষায় অনূদিত হতে শুরু করে। এই উদ্যোগের ফলে মুসলমানরা শুধু ধর্মীয় জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং মানব সভ্যতার সামগ্রিক জ্ঞানকে আত্মস্থ করার সুযোগ পায়। গণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞান, দর্শন ও জ্যোতির্বিদ্যায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে ফিকহ ও হাদিসশাস্ত্র মানসুরের সময়েই সুসংগঠিত রূপ লাভ করে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতো মহান ফকিহ এই যুগেই ইসলামী আইনশাস্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করেন। যদিও মানসুরের সঙ্গে তাঁর মতানৈক্য ছিল, তবু জ্ঞানের প্রশ্নে খলিফা তাঁর মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখেন। এই সময়েই বিভিন্ন মাজহাবের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তী মুসলিম উম্মাহর জন্য পথনির্দেশক হয়ে ওঠে।

মানসুর কেবল ধর্মীয় জ্ঞান নয়, ইতিহাস রচনাকেও গুরুত্ব দেন। ইসলামী ইতিহাসকে সংরক্ষণ ও লিপিবদ্ধ করার কাজ তাঁর সময়েই গতি পায়। নবী (সা.)-এর জীবন, সাহাবাদের অবদান এবং ইসলামী বিজয়ের ইতিহাস লিখিত আকারে সংরক্ষিত হতে থাকে। এর ফলে মুসলিম জাতি নিজেদের অতীত সম্পর্কে সচেতন হতে শেখে।

এই যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞানেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। হাসপাতাল, চিকিৎসালয় এবং ওষুধবিজ্ঞানের চর্চা বিস্তৃত হয়। মুসলিম চিকিৎসকরা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ শুরু করেন। এই জ্ঞান পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিত্তি রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

খলিফা মানসুরের আরেকটি বড় অবদান হলো জ্ঞানকে শ্রেণিভিত্তিক গণ্ডি থেকে বের করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। মসজিদ, মাদরাসা ও শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে জ্ঞানচর্চা বিস্তৃত হয়। শিক্ষালাভ তখন কেবল অভিজাতদের অধিকার ছিল না; বরং সাধারণ মানুষও জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হওয়ার সুযোগ পায়।

মানসুরের সময়ে দিক্বিদিক ইসলামী জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ে। পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত মুসলিম বিশ্ব এক বুদ্ধিবৃত্তিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়। জ্ঞান তখন সীমান্ত মানত না, ভাষা ও জাতির ভেদাভেদ ভুলে এক সর্বজনীন রূপ লাভ করে। এই ধারাবাহিকতা পরবর্তী খলিফাদের সময় আরও বিস্তৃত হয়।

পরবর্তী যুগে এই জ্ঞান মুসলিম উম্মাহর জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। ফিকহ, আকিদা, তাফসির ও হাদিসশাস্ত্রের যে ভিত্তি মানসুরের যুগে রচিত হয়েছিল, তা আজও মুসলমানদের জীবন পরিচালনায় দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা জ্ঞানভিত্তিক সভ্যতা আজও ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল।

আব্বাসীয় খলিফা মানসুর প্রমাণ করেছিলেন, শক্তির প্রকৃত উৎস অস্ত্র নয়, বরং কলম। তিনি বুঝেছিলেন, জ্ঞান ছাড়া রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না, সভ্যতা গড়ে ওঠে না। তাঁর শাসনামল তাই কেবল রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, বরং ইসলামী জ্ঞানের ইতিহাসে এক স্বর্ণালী অধ্যায়।

আজকের মুসলিম বিশ্ব যখন নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন মানসুরের এই জ্ঞানদর্শন আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। ইসলামের পুনর্জাগরণ কোনো হঠাৎ বিপ্লবে নয়, বরং জ্ঞান, চিন্তা ও বিবেকের ধারাবাহিক চর্চার মাধ্যমেই সম্ভব—এই সত্যটি খলিফা মানসুর তাঁর কর্মের মাধ্যমে ইতিহাসে স্থায়ীভাবে লিখে গেছেন।

লেখক : কলামিস্ট, এমফিল গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষক গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

মাদরাসা শিক্ষা

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর