Logo

শিক্ষা

শিক্ষকের সঙ্গে অভিভাবকের আচরণ

Icon

মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ২০:০০

শিক্ষকের সঙ্গে অভিভাবকের আচরণ

শিক্ষক হচ্ছেন জাতির পথপ্রদর্শক, সমাজের আলোকবর্তিকা। একটি শিশুর জ্ঞান, চরিত্র ও নৈতিক গঠনে শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। অভিভাবক যেমন সন্তানকে জন্ম দিয়ে লালন-পালনের দায়িত্ব নেন, তেমনি শিক্ষক তাঁর জ্ঞান, সময় ও শ্রম ব্যয় করে সেই সন্তানকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন।

জ্ঞানীদের মর্যাদা কোরআনের দৃষ্টিতে
আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে?’ (সুরা যুমার : ৩৯/৯) এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জ্ঞানীদের মর্যাদা তুলে ধরেছেন। শিক্ষক হচ্ছেন জ্ঞান বিতরণকারী। তাই তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা ঈমানদারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের হুকুম হাদিসে
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেন— ‘তিন প্রকারের মানুষের প্রতি অসম্মান করা কিয়ামতের দিন আল্লাহর অসন্তোষকে ডেকে আনে— বুড়ো মুসলিম, মুসলিম শাসক এবং কোরআনের হাফেজ যিনি তাতে বাড়তি কিছু যোগ করেননি বা অপব্যবহার করেননি।’ (আবু দাউদ : ৪৮৪৩) এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, যারা দ্বীন শেখায় বা দ্বীনি জ্ঞান রাখে, তারা সম্মান পাওয়ার উপযুক্ত। শিক্ষকের প্রতি সম্মান দেখানো তাই একটি ধর্মীয় কর্তব্য।

অভিভাবক ও শিক্ষকের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব
ইসলামে একে অপরকে সহযোগিতা করার বিষয়ে বলা হয়েছে— ‘নেক কাজে ও তাকওয়ায় তোমরা একে অপরকে সহযোগিতা করো।’ (সুরা মায়েদা : ৫/২] একজন অভিভাবক যখন শিক্ষককে সহযোগিতা করেন এবং তাঁর নির্দেশনা ও পরামর্শ অনুযায়ী সন্তানকে গড়ে তোলেন, তখন তা দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণ বয়ে আনে।

শিক্ষকের সঙ্গে বিনয়ী ও সহনশীল আচরণ
রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বোত্তম, যে নিজের শিক্ষক থেকে জ্ঞান গ্রহণ করে ও সম্মান করে।’ (ইবনে মাজাহ) অভিভাবকরা যদি শিক্ষকের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেন, সন্তানের চোখে সেই শিক্ষকের মর্যাদা কমে যায়। এর ফলে সন্তান জ্ঞান লাভে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে এবং আদব ও চরিত্রের অভাব দেখা দেয়।

শিক্ষকের সমালোচনায় সংযত থাকা
ইসলাম গিবত (পরনিন্দা) করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। অনেক সময় দেখা যায়, অভিভাবকরা সন্তানের সামনেই শিক্ষকের সমালোচনা করেন। এর ফলে শিক্ষকের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় এবং শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হয়। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে— ‘তোমরা একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি পছন্দ করবে, সে তার মৃত ভাইয়ের মাংস খাবে?’ (সুরা হুজরাত : ৪৯/১২) শিক্ষকের ভুল-ত্রুটি থাকলেও তা সংশোধনের জন্য শালীনভাবে, একান্তে এবং সম্মান বজায় রেখে কথা বলা উচিত।

সন্তানদের সামনে শিক্ষকের মর্যাদা তুলে ধরা
সন্তানের মনোজগতে শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলার জন্য অভিভাবকের ভূমিকা অপরিহার্য। যদি বাবা-মা সন্তানের সামনে বলেন— ‘তোমার শিক্ষক খুব জ্ঞানী ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি,’ তাহলে সন্তান তাঁর প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা পোষণ করবে। রাসুল সা. বলেন— ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের আদব শেখাও, কারণ তারা তোমাদের পরবর্তী প্রজন্ম।’ (তিরমিজি) এখানে ‘আদব’ শব্দের মধ্যে শিক্ষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শনও অন্তর্ভুক্ত।

শিক্ষকের দোয়ার বরকত
যে অভিভাবক শিক্ষকের সাথে সম্মানজনক আচরণ করেন, শিক্ষকও সন্তুষ্ট চিত্তে তার সন্তানের জন্য দোয়া করেন। আল্লাহর নিকট একজন আলেম বা শিক্ষকের দোয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে এসেছে— ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফেরত দেওয়া হয় না— রোজাদারের ইফতারের সময়, ন্যায়বান শাসকের দোয়া এবং মজলুমের দোয়া।’ (তিরমিজি) যদিও এখানে সরাসরি শিক্ষকের কথা বলা হয়নি, কিন্তু ইমামরা ব্যাখ্যা করেছেন, যারা আল্লাহর পথে জ্ঞান বিতরণ করেন, তাঁদের দোয়া খুবই মূল্যবান।

শিক্ষকের হক আদায় করা
ইমাম গাযালি (রহ.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার শিক্ষককে সম্মান করে না, সে কখনো জ্ঞান লাভে পরিপূর্ণ হতে পারে না।’ শিক্ষক যদি কোনো অভিভাবকের সন্তানকে শাসন করেন বা সংশোধনমূলক দিকনির্দেশনা দেন, তা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত। এটাই শিক্ষকের হক।

সন্তান ও শিক্ষককে দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলা উচিত নয়
অনেক সময় সন্তান ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিভাবকের মনে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। একজন সচেতন মুসলিম অভিভাবক হিসেবে উচিত, বিষয়টি যাচাই করে বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমাধান করা। রাসুল সা. বলেছেন, ‘মুসলমান ভাইয়ের প্রতি সুপরামর্শ দেওয়া ঈমানের অংশ।’ (সহিহ মুসলিম) শিক্ষককে শত্রু নয়; বরং সন্তান গঠনের সহযাত্রী হিসেবে দেখা উচিত।

সন্তান ও শিক্ষক : উভয়ের প্রতি দয়া ও সহমর্মিতা
রাসুলুল্লাহ সা. বলেন— ‘যে ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (তিরমিজি) এ হাদিসের আলোকে দেখা যায়, শিক্ষক যেহেতু জ্ঞানে ও অভিজ্ঞতায় বড়, তাই তাদের সম্মান না করা ইসলামি আদর্শ বিরুদ্ধ কাজ।

শালীনভাবে সমাধান করা
শিক্ষকের মর্যাদা ইসলামে অত্যন্ত উচ্চ। একজন অভিভাবক যদি সন্তানকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান, তবে তার প্রথম কর্তব্য হলো- শিক্ষককে সম্মান করা, তাঁর পরামর্শ মেনে চলা, সন্তানের সামনে তাঁর মর্যাদা তুলে ধরা এবং কোনো ভুল-বোঝাবুঝি হলে তা শালীনভাবে সমাধান করা। কোরআন ও হাদিস আমাদের এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। সমাজে জ্ঞান, নৈতিকতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অভিভাবক ও শিক্ষকের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা অপরিহার্য। আল্লাহ আমাদের সবাইকে শিক্ষকদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, কোনাবাড়ি, গাজীপুর; শায়খুল হাদিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া, গাজীপুর।

বিকেপি/এমএইচএস

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

মাদরাসা শিক্ষা

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর