প্রিয় শিক্ষার্থীরা, আজ তোমাদের পঞ্চম শ্রেণির বাংলা পাঠ ৭ এর সাইক্লোন কবিতার প্রশ্ন উত্তর আলোচনা করা হয়েছে। এই অধ্যায় থেকে মূল বইয়ের অনুশীলনীর সকল সমাধান দেওয়া হলো। আশা করি তোমাদের কাজে আসবে।
সাইক্লোন
শামসুর রাহমান
চাল উড়ছে, ডাল উড়ছে
উড়ছে গরু, উড়ছে মোষ।
খই উড়ছে, বই উড়ছে
উড়ছে পাঁজি, বিশ্বকোষ।
ময়লা চাদর, ফরসা জামা,
উড়ছে খেতের শর্ষে, যব।
লক্ষ্মীপ্যাঁচা, পক্ষীছানা
ঘুরছে, যেন চরকি সব।
মাছ উড়ছে, গাছ উড়ছে
ঘুর্ণি হাওয়া ঘুরছে জোর।
খাল ফুলছে, পাল ছিঁড়ছে
রুখবে কারা পানির তোড়?
হারান মাঝি, পরান শেখ
বাতাস ফুঁড়ে দিচ্ছে ডাক।
আকাশ ভেঙে কাঁচের গুঁড়ো
উঠল আজান, বাজল শাখ।
চম্পাবতীর কেশ ভাসছে
ভাসছে স্রোতে খড়ের ঘর।
শেয়াল কুকুর কুঁকড়ো শালিক
ডুবল সবই, ডুবলো চর।
সাইক্লোন কবিতার মূলভাব
শামসুর রাহমানের “সাইক্লোন” কবিতায় ঘূর্ণিঝড়ের ভয়ংকর রূপকে অত্যন্ত তীব্র ও জীবন্ত ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। কবি দেখান, প্রলয়ঙ্করী বাতাসে চাল-ডাল, বই-পত্র, কাপড়চোপড়- এমনকি গরু-মোষ পর্যন্ত উড়ে যায়; গাছ, মাছ, ফসল, পাখি- সবকিছুই ঘূর্ণির টানে ছিটকে পড়ে এবং চারদিকটা এক ভয়াল অরাজকতায় ভরে ওঠে। পানির তোড়ে খাল ফুলে ওঠে, নৌকার পাল ছিঁড়ে যায়, ঘরবাড়ি ভেসে যায়, চর ডুবে যায়- মানুষ, প্রাণী ও প্রকৃতি সবাই পড়ে চরম বিপদের মুখে। এই ধ্বংসের মধ্যেও মানুষের আর্ত ডাক, আজান ও শাঁখধ্বনি একসঙ্গে মিশে সৃষ্টি করে শোক, আতঙ্ক ও অসহায়তার গভীর আবহ। কবিতার মূল কথা হলো- প্রকৃতির সামনে মানুষ কতটা ক্ষুদ্র ও অসহায়, আর এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় কীভাবে মুহূর্তে জীবন-জগৎকে তছনছ করে দিয়ে সর্বত্র বিপর্যয় ও করুণ বাস্তবতা এনে দেয়।
১. শব্দ দিয়ে বাক্য তৈরি করি।
বিশ্বকোষ: আমরা বিশ্বকোষ থেকে পৃথিবীর নানান অজানা তথ্য জানতে পারি।
ঘূর্ণি হাওয়া: হঠাৎ এক পশলা ঘূর্ণি হাওয়া এসে উঠানের সব তুলা উড়িয়ে নিয়ে গেল।
আকাশ ভেঙে: এত বড়ো দুঃসংবাদ শুনে যেন লোকটির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।
ধোয়া জামা: প্রতিদিন বাইরে বের হওয়ার আগে সে ধোয়া জামা পরে নেয়।
খড়ের ঘর: গ্রামের অধিকাংশ গরিব মানুষের বসবাস খড়ের ঘরে।
২. যত পারি মিল-শব্দ তৈরি করি।
চাল: ডাল, তাল, খাল, মাল, পাল, গাল, কাল, শাল
খই: বই, কই, রই, সই, দই, লই, ধুই
গরু: শুরু, মরু, তরু, সরু
মোষ: ঘোষ, দোষ, কোষ, তোষ, রোষ, খোশ
জোর: ভোর, ডোর, চোর, ঘোর, তোর, মোর, ওর
ছানা: মানা, জানা, কানা, টানা, নানা, সোনা, পানা
৩. প্রশ্নের উত্তর বলি ও লিখি।
ক. কবিতায় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: কবিতায় সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় নামক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা বলা হয়েছে।
খ. ঝড়ে কী কী উড়ছে তার তালিকা তৈরি করি।
উত্তর: কবিতা অনুযায়ী ঝড়ে যা যা উড়ছে, তার তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
* খাদ্য ও শস্য: চাল, ডাল, খই, শর্ষে, যব।
* বস্তু ও কাগজপত্র: বই, পাঁজি, বিশ্বকোষ, ময়লা চাদর, ফরসা জামা।
* প্রাণী: গরু, মোষ, লক্ষ্মীপ্যাঁচা, পক্ষীছানা।
গ. চম্পাবতীর কেশ জলে ভাসছে কেন?
উত্তর: ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে আসা প্রবল জলোচ্ছাসের কারণে ঘরবাড়ি, চরসহ সবকিছু ডুবে গেছে। এই প্রবল স্রোতের জলে সব কিছু ভেসে যাওয়ার কারণে চম্পাবতীর কেশও ভাসছে।
ঘ. আজান দেওয়া ও শাঁখ বাজানোর কথা বলা হচ্ছে কেন?
উত্তর: আজান দেওয়া ও শাঁখ বাজানোর কথা বলা হচ্ছে কারণ ঘূর্ণিঝড়টি এতই ভয়ঙ্কর যে মানুষ জীবন বাঁচাতে এবং বিপদ থেকে রক্ষা পেতে ধর্মীয় প্রার্থনা ও সৃষ্টিকর্তার শরণাপন্ন হচ্ছে। এটি চরম বিপদের সময় মানুষের শেষ আশ্রয়কে নির্দেশ করে।
৪. সবাই মিলে হাতে তালি দিয়ে একসাথে কবিতাটি পড়ি।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের সহায়তায় কাজটি করবে।
৫. কবিতার কাজ-শব্দগুলো আলাদা করি এবং সেগুলো দিয়ে বাক্য লিখি।
কাজ-শব্দ / মূল ক্রিয়াপদ / কাজ-শব্দ দিয়ে বাক্য
উড়ছে — ওড়া — ঘুর্ণি হাওয়ায় চাল, ডাল, গরু ও মোষ উড়ছে।
ঘুরছে — ঘোরা — ঝড়ের মধ্যে লক্ষ্মীপ্যাঁচা আর পক্ষীছানা চরকির মতো ঘুরছে।
ফুলছে — ফোলা — প্রবল পানির তোড়ে খাল ফুলছে।
ছিঁড়ছে — ছেঁড়া — সাইক্লোনের তীব্রতায় নৌকার পাল ছিঁড়ছে।
রুখবে — রোখা — এই পানির তোড় কারা রুখবে?
দিচ্ছে — দেওয়া — হারান মাঝি আর পরান শেখ বাতাস ফুঁড়ে ডাক দিচ্ছে।
উঠল — ওঠা — বিপদের সময় মানুষ ভয়ে আজান উঠল।
বাজল — বাজা — বিপদ দেখে মন্দিরে শাঁখ বাজল।
ভাসছে — ভাসা — স্রোতের মধ্যে চম্পাবতীর কেশ ভাসছে।
ডুবল — ডোবা — জলোচ্ছাসে শেয়াল কুকুরসহ সবই ডুবল।
৬. নিজের দেখা বা শোনা একটি দুর্যোগের বিষয়ে অনুচ্ছেদ লিখি।
একটি ঘূর্ণিঝড়ের অভিজ্ঞতা: আমি আমার জীবনে একটি ভয়ানক ঘূর্ণিঝড়ের অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলাম। আমাদের অঞ্চলে সেটি ‘আমফান’ নামে পরিচিত ছিল। এটি ছিল আমার দেখা সবচেয়ে বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
ঘূর্ণিঝড়টি আসার আগের দিন থেকেই আবহাওয়া খুব খারাপ হতে শুরু করে। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল এবং সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠেছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছিল। যখন ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানল, তখন তার সঙ্গে প্রচণ্ড বেগে বাতাস বইতে শুরু করে। বাতাসের শব্দে মনে হচ্ছিল যেন সবকিছু ভেঙে পড়ছে। বহু কাঁচা বাড়ি, টিনের চালা এবং বড় বড় গাছপালা গোড়া থেকে উপড়ে পড়ে গিয়েছিল। বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আশেপাশের ধানখেত এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড়ের সময় ভারী বৃষ্টিপাত এবং কিছু কিছু এলাকায় জলোচ্ছাসও হয়েছিল।
ঘূর্ণিঝড় চলে যাওয়ার পর চারিদিকে শুধু ধ্বংসের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। রাস্তাঘাট বন্ধ, চারদিকে জল জমে ছিল এবং অসংখ্য মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল। বেশ কয়েক দিন লেগেছিল সবকিছু স্বাভাবিক হতে। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছিল যে প্রকৃতির কাছে মানুষ কতটা অসহায় এবং দুর্যোগের সময় আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া কতটা জরুরি।
প্রতিষ্ঠাতা, কোর্সটিকা
বিকেপি/এমএম

