সুরে-ভাষায় বৈচিত্র্য
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে আদিবাসী দিবস উদযাপন
গবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ২৩:৩৭
ছবি: সংগৃহীত
একপশলা বৃষ্টির পর তখন বিকালের লালাভ আলো ছড়িয়ে পড়েছে ভুবনে। যেন মায়া ঝরা এক আবহ নামছে ধীরে ধীরে। সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সপোর্ট চত্বরে তখন এক অন্যরকম আলো। ভাষার আলো, সুরের আলো, না-বলা গল্পের আলো।
রোববার (৯ আগস্ট) বিকাল চারটায় শুরু হওয়া এই আয়োজন যেন এক মুহূর্তের জন্য পাহাড়কে নামিয়ে এনেছিল সমতলে।
উপলক্ষ ছিল আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান জানানো ও জীবন-সুরক্ষার কথা। কিন্তু গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনের নাম ছিল আরও ব্যঞ্জনাময়— ‘বৈচিত্র্যের সম্প্রীতি: আলোচনা ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা’। নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল দিনটির দর্শন! বৈচিত্র্য থাকুক, কিন্তু তার ভেতর দিয়ে বয়ে যাক সম্প্রীতির নদী।
আলোচনা পর্বে উঠে এলো শুধু উৎসবের রং নয়, বাস্তবতার কাঁটাও। দূরের পাহাড়ি জনপদ থেকে সমতলের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের যাত্রাপথ যে সহজ নয়— যাতায়াতের ভোগান্তি, নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর সংগ্রাম সে কথাই বললেন বক্তারা।
গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি ইয়াছিন আল মৃদুল দেওয়ান জানালেন, এই ক্যাম্পাসে অর্ধশতাধিক আদিবাসী শিক্ষার্থী নানা বাধা পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন, আর তাদের প্রাপ্য মূল্যায়ন নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয়েরই দায়িত্ব।
মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও ছাত্র উপদেষ্টা শাহ আলমের কণ্ঠেও ছিল একই ধরনের মমতা। পাহাড় থেকে নেমে আসা শিক্ষার্থীদের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধাগুলো কাজে লাগিয়ে আরও বেশি আদিবাসী শিক্ষার্থী যেন এখানে ভর্তি হতে পারে, নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায়।
অনুষ্ঠানের সভাপতি অভিজিৎ চাকমার স্বাগত বক্তব্যে ফুটে উঠেছিল এক গভীর প্রত্যাশা ভাষা, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়, বরং তা হয়ে উঠুক জাতীয় বৈচিত্র্যের গর্বের অংশ। তার ভাষায়, উচ্চশিক্ষায় আদিবাসী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো আর নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ তৈরি করা, এই দুটো মিলিয়েই গড়ে উঠবে প্রকৃত সম্প্রীতির সমাজ।
আলোচনা শেষে মঞ্চ ছেড়ে দিল কথাকে, জায়গা করে দিল সুরকে। শুরু হলো সাংস্কৃতিক পর্ব। আদিবাসী শিক্ষার্থীরা একে একে তুলে ধরলেন নিজ নিজ জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী গান, নাচ আর ভাষার সৌন্দর্য। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে সেই পরিবেশনা যেন হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত জাদুঘর, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সুর বহন করছিল শত বছরের ইতিহাস আর পরিচয়ের গল্প।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শুভানুধ্যায়ী সবার মেলবন্ধনে দিনশেষে ট্রান্সপোর্ট চত্বর যেন হয়ে উঠল ছোট্ট একটা বাংলাদেশ যেখানে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সুর, ভিন্ন পোশাক একসাথে বসে গাইল সম্প্রীতির গান। আর সেই গানের প্রতিধ্বনি রয়ে গেল অনেকক্ষণ, ক্যাম্পাসের বাতাসে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

