ছবি: সংগৃহীত
১৯ আগস্টকে বলা হয় বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির পরিবর্তনে আলোকচিত্রের ধরন বদলালেও একটি মুহূর্তকে ধরে রেখে তা স্মৃতিতে পরিণত করার আবেদন আজও অটুট। মানুষের অনুভূতি, সমাজের বাস্তবতা কিংবা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত সবকিছুকেই একটি ফ্রেমে তুলে ধরার শক্তি রয়েছে আলোকচিত্রের।
একজন আলোকচিত্রী তাই শুধু দৃশ্য ধারণ করেন না, তার ক্যামেরায় ধরা পড়ে সময়, মানুষ ও জীবনের নানা গল্প। বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস উপলক্ষে আলোকচিত্রের প্রতি তাদের ভালোবাসা, অভিজ্ঞতা, একটি ভালো ছবির গল্প এবং পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে আলোকচিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোকচিত্রীদের মতামত তুলে ধরেছেন শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী জান্নাতুল লামিশা।
আলোকচিত্রে সৌন্দর্যের চেয়ে গল্পের গুরুত্ব
আলোকচিত্র একটা ভাষা। একটা মুহূর্তকে আমি যেভাবে দেখি, অনুভব করি এবং অন্যদের কাছে তুলে ধরতে চাই আলোকচিত্র তারই প্রকাশ। আমাদের অপ্রকাশিত অনুভূতিগুলোই ফুটে ওঠে ছবির মাধ্যমে। একটা ছবি তোলার আগে জানা দরকার আমি কী তুলতে চাই। ছবির গল্প, কম্পোজিশন ও ফ্রেমিং মাথায় রেখে ছবি তোলার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। আমার তোলা ছবি যদি কোনো গল্পই বলতে না পারে, তাহলে সেটা হয়তো মনে দাগ কাটবে না। তাই মৌলিক নিয়ম শেখার পাশাপাশি প্রচুর ছবি দেখা ও নিয়মিত চর্চা করা জরুরি। সুন্দর ছবি প্রথম দেখাতেই চোখে ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে। রং, আলো বা দৃশ্যের সৌন্দর্য ছবিটিকে দৃষ্টিনন্দন করে। অন্যদিকে, ভালো ছবির গল্প ও বার্তা দর্শকের মনে গভীরভাবে ছাপ ফেলে। সুন্দর ছবি চোখকে তৃপ্ত করে, কিন্তু ভালো ছবি মানুষের মনকে স্পর্শ করে এবং দীর্ঘদিন মনে থাকে।
আবীর আহম্মেদ উৎস
সভাপতি,
ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (ডিইউপিএস)।
ছবির ফ্রেমে ধরা পড়ে সময়ের নীরব ভাষা
আলোকচিত্র আমাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাস সবকিছুরই গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একটি ছবি মানুষের আনন্দ, বেদনা, সংগ্রাম, পরিবর্তন ও সম্ভাবনাকে এক ফ্রেমে ধারণ করতে পারে। সংবাদ, সামাজিক আন্দোলন, সংস্কৃতি কিংবা দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য ঘটনা আমরা ছবির মাধ্যমে স্মরণ করি ও বুঝতে শিখি। তাই আলোকচিত্র শুধু স্মৃতি সংরক্ষণের মাধ্যম নয়; এটি সমাজকে দেখার ও বোঝারও একটি শক্তিশালী ভাষা। আলোকচিত্রী প্রতিটি ছবি সৌন্দর্য ও নীরবতা ছবিতে ধরে রাখে। ছবিটি দেখলেই মনে হবে সেই মুহূর্তে ফিরে গেছি। তাই এটি শুধু ছবি নয়, অনুভব করে রাখা একটি সময়। AI-এর যুগেও বাস্তব আলোকচিত্রের গুরুত্ব কমবে ন, AI এমন দৃশ্য তৈরি করতে পারে, যা বাস্তবে কখনো ঘটেনি। কিন্তু বাস্তব ছবি নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে। তাই বাস্তবতাকে ধারণ ও সত্যকে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আলোকচিত্রের গুরুত্ব আরও গভীর হচ্ছে।
নাজমুল মুক্তাদীর সাইমুম
সভাপতি
গণ বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটি।
ক্যামেরার ফ্রেমে নারীর দৃষ্টিভঙ্গি, গল্পে সমতার ভাষা
ফটোগ্রাফিতে একজন নারী হিসেবে বাড়তি কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। বাইরে ছবি তুলতে গেলে নিরাপত্তা, সময় ও সঙ্গে কে আছে এসব ভাবতে হয়। পরিবার থেকেও অনেক সময় প্রশ্ন আসে, ফলে নিজের আগ্রহকে প্রমাণ করতে হয়। মেয়েদের সক্ষমতা নিয়েও অদৃশ্য সন্দেহ থাকে। রাস্তায় ক্যামেরা নিয়ে বের হলে আড়চোখে তাকানো বা টিজ করার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। ক্যামেরা হাতে নারী-পুরুষ নয়, একজন আলোকচিত্রীর দৃষ্টিভঙ্গিই গুরুত্বপূর্ণ কী দেখছি, কীভাবে দেখছি এবং গল্পটি কীভাবে তুলে ধরছি, সেটাই আসল।আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র দিবস; গল্প বলা, অনুভূতি প্রকাশ ও মুহূর্ত ধরে রাখার ক্ষমতাকে উদযাপনের দিন। আমার কাছে ফটোগ্রাফি মানে ‘Art of noticing’—একই পৃথিবী সবাই দেখলেও একজন আলোকচিত্রী সেটিকে ভিন্নভাবে দেখতে শেখেন। তাই ছবি শুধু সুন্দর নয়, অনুভব করার মতোও হওয়া উচিত। জাতীয় পর্যায়ে নারী আলোকচিত্রীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও তাঁদের কাজের যথাযথ স্বীকৃতি ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। নিরাপত্তা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা দূর করে নারী আলোকচিত্রীদের জন্য আরও সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
তানজিয়া আমরিন
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটি।
একটি ছবি, এক টুকরো সময়ের স্মৃতি
মানুষ মূলত কোনো মুহূর্তকে স্মৃতির পাতায় ধরে রাখতেই ছবি তোলে। পুরোনো অ্যালবামের পাতায় শৈশব, প্রিয় মানুষ কিংবা হারিয়ে যাওয়া সময়কে ফিরে পাওয়া যায়। তাই আমার কাছে আলোকচিত্র এক ধরনের ‘স্মৃতির টাইম ট্রাভেলার’যে মুহূর্ত একবার চোখে দেখি, ছবির মাধ্যমে সেটিই বারবার দেখার সুযোগ পাই। জীবনকে স্মৃতিতে রঙিন করে রাখার অন্যতম মাধ্যম হলো আলোকচিত্র। প্রতিটি ছবির নিজস্ব গল্প, কম্পোজিশন ও অনুভূতি রয়েছে। অতিরিক্ত ফিল্টার বা এডিটিং ছবির আবেগ নষ্ট করতে পারে। তবে সঠিক এডিটিং খাবারে লবণের মতো ছবির স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও মানকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বর্তমান AI-এর যুগে ছবি তৈরি, এডিটিং কিংবা কালার গ্রেডিং সহজ হচ্ছে। তবে কোন মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন গল্প মানুষের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন সেই সিদ্ধান্তে মানুষের সৃজনশীলতা ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার বিকল্প নেই। নতুন প্রজন্মের আলোকচিত্রীদের বলব, ইচ্ছা ও লক্ষ্য থাকলে মানুষ পারে না এমন কিছুই নেই। লেগে থাকো।
সাইমুন মুনতাছির সিজান
ফাউন্ডার
আইইউবিএটি ফিল্মস অ্যান্ড ফটোগ্রাফি।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

