কলকাতায় গ্রেপ্তার হওয়া বাংলাদেশি নারী মডেল ও অভিনেত্রী শান্তা পালের নাম এখন দুই বাংলার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ৩০ জুলাই যাদবপুরের একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে লালবাজারের গোয়েন্দারা। ভারতীয় পরিচয়পত্রসহ সন্দেহজনক কিছু নথিপত্র পাওয়ার পর থেকেই তদন্তের ঘূর্ণিপাকে পড়ে যান তিনি। তবে প্রশ্ন উঠছে— কে এই শান্তা পাল?
শান্তা পালের শোবিজ যাত্রা শুরু হয় ২০১৪ সালে, ‘মিস ফেস লুক’ প্রতিযোগিতায় বিজয়ের মাধ্যমে। এরপর জনপ্রিয় কোরিওগ্রাফার বিবি রাসেল ও আজরা মাহমুদের মতো গুণীজনদের সঙ্গে র্যাম্পে হেঁটেছেন। অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশ-কলকাতা যৌথ আয়োজনে ‘বর্ষা সুন্দরী’ প্রতিযোগিতায়, যেখানে তিনি চতুর্থ স্থান অর্জন করেন। ২০১৯ সালে ২৪টি দেশের প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে ‘মিস এশিয়া গ্লোবাল’- এ জায়গা করে নেন সেরা পাঁচে।
অভিনয়ের দুনিয়ায়ও শান্তা পা রেখেছেন দৃপ্ত পদক্ষেপে। নাটক, টেলিফিল্ম, মেগা সিরিয়াল ও বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন। অভিনয় ছাড়া অনুষ্ঠান সঞ্চালনাও করতেন শান্তা। যদিও দেশে বড় পর্দায় কাজের প্রস্তাব পেলেও, তা শেষ পর্যন্ত হয়নি। এরপর নজর ঘোরান কলকাতা ও দক্ষিণ ভারতের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির দিকে।
কলকাতায় একটি চলচ্চিত্রে অঙ্কুশ হাজরার বিপরীতে লিড চরিত্রে অভিনয়ের কথা ছিল তার। একইসঙ্গে তেলেগু পরিচালক বিশ্বনাথ রাওয়ের ‘ইয়া রা লাভা’ নামে একটি থ্রিলার সিনেমাতেও চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। কাজ করার কথা ছিল বলিউড ও দক্ষিণ ভারতীয় আরও কয়েকটি প্রজেক্টেও। পাশাপাশি, তিনি ভারতীয় বিভিন্ন বিউটি কনটেস্টে বিচারক হিসেবেও যুক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
তবে এই উত্থানের মাঝেই তিনি প্রকাশ্যে আনেন কলকাতার এক পরিচালকের বিরুদ্ধে কাস্টিং কাউচের অভিযোগ। অভিযোগ তোলেন পরিচালক রাজীব বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। শান্তা সেমসয় এই প্রতিবেদককে জানিয়েছিলেন, ‘আমি রাজীবকে জানিয়ে দিয়েছিলাম, শুধু মেধাকে প্রাধান্য দেওয়া জায়গাতেই কাজ করব। কিন্তু তিনি আমাকে অন্যভাবে প্ররোচিত করতে থাকেন। তাই তাকে না করে দিই। সত্য পথে থাকলে, প্রতিবাদ করলে ঝুঁকি নিতে হয়। আমাকে অনেকে হুমকি দিচ্ছেন, বলছেন ব্যান্ড করে দেবেন। কিন্তু আমি চাই, আর কোনো মেয়ে যেন ফাঁদে না পড়ে।’
সেসময় শান্তা এমন দৃঢ় অবস্থানে থাকলেও এখন তিনি নিজেই ফেঁসে গেছেন অসততার দায়ে। ইতোমধ্যেই পুলিশ তাকে আট দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। তার কাছ থেকে ভারতীয় আধার কার্ড, ভোটার আইডি, বাংলাদেশি মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও একটি বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সের পরিচয়পত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, অ্যাপভিত্তিক ক্যাব সার্ভিসের ব্যবসার আড়ালে কিছু অসঙ্গতি নজরে আসে। ২০২৩ সাল থেকে কলকাতায় বসবাস করলেও তার পরিচয় ও ঠিকানা নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তি পাওয়া গেছে। তদন্তকারীদের মতে, শান্তা নিজেই একাধিক সময় আলাদা পরিচয় ব্যবহার করেছেন এবং এ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ঠাকুরপুর থানায় একটি প্রতারণার মামলাও দায়ের করেছিলেন।
এই মামলার সূত্র ধরেই শান্তার অতীত ও ভারতীয় নাগরিকত্ব সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র ঘিরে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। শান্তা ভারতের নাগরিক কীভাবে হলেন, তার কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি।
এই গ্রেপ্তার নিয়ে এখন তদন্ত চলছে, প্রশ্ন উঠছে— শান্তা একা নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো বৃহৎ চক্র? তবে একথা নিশ্চিত, শোবিজ অঙ্গনের আলোচনায় উঠে আসা এই নারী এখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জেরার মুখে।

