Logo

বিনোদন

নামনামা

Icon

মোহাম্মাদ জাকারিয়া

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৫, ১৩:৫২

নামনামা

'কিছু নাম আছে, মনে পড়ে ক্ষণে ক্ষণে
কিছুতেই ভোলা যায় না
কিছু নাম আছে, ঝরে পড়ে আগে-পরে
তবু পুরোপুরি ঝরে যায় না।।'

আজ নায়করাজ রাজ্জাকের প্রয়াণ দিবস। নায়ক রাজ্জাক প্রসঙ্গ আসলে আমার মানসপটে আহমদ জামান চৌধুরী ভেসে ওঠেন। আহমদ জামান চৌধুরী যিনি ‘আজাচৌ’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন। আমার জীবনে এই একজন শিক্ষক পেয়েছিলাম যার সঙ্গে মন খুলে যেকোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারতাম। 

তাঁর সঙ্গে প্রথম যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাক্ষাৎ হলো সেদিন তাঁকে বলেছিলাম, স্যার, আব্দুল গাফফার চৌধুরী কি আপনার কেউ হন? 

স্যার কপালে ভাঁজ পড়া চামড়া আরও খানিক কুঁচকে বললেন, না তো! কেন এমন মনে হলো তোমার, বল তো?

 আব্দুল গাফফার চৌধুরী লেখেন আগাচৌ, আপনি লেখেন আজাচৌ, এজন্যই বললাম।

বাঁধাই করা সামনের দাঁতগুলো বের করে হেসে বললেন, আমার আরও একটা  নাম আছে, খোকা। 

বাংলাদেশের গড় আয়ু বয়সী একজন মানুষের নাম খোকা!— মনের ভেতরে এমন জল্পনা-কল্পনা বাসা বাঁধার আগেই তিনি বললেন, পরিবারের সবার ছোট ছিলাম তো! এজন্য সবাই খোকা নামে ডাকত। এখনও সবাই এ নামেই ডাকে। খোকা নামের মানুষেরা মরে গেলেও খোকাই থাকে (হাসি)।

আহমদ জামান চৌধুরী (আজাচৌ), চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার কিংবদন্তি, চিত্রালীর সম্পাদক (যে-চিত্রালীতে কোনও শিল্পীকে নিয়ে দু-লাইন লিখলে নিজেকে ধন্য মনে করতেন), চিত্রনাট্যকার,  পিচঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি, যেও না সাথি, এই বৃষ্টি ভেজা রাতে চলে যেও না— এরকম অসংখ্য কালজয়ী গানের রচয়িতা। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী চিত্রনাট্যকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। 

নায়ক রাজ্জাককে ‘নায়করাজ’ উপাধি তিনিই দিয়েছিলেন। ‘মেগাস্টার’ শব্দটা নিয়ে এখন চারিদিকে তোলপাড়। ঢালিউডে সর্বপ্রথম মেগাস্টার বসে নায়ক উজ্জ্বলের নামের আগে। এটিও আজাচৌর দেওয়া। যেহেতু লেখার শিরোনাম 'নামনামা' তাই এসব বলছি। সে যা-ই হোক।

২০১০ সালের কোনও এক দুপুরবেলা। গ্রিন বিশ্ববিদ্যালয়। আজাচৌ তাঁর রুমে বসে আছেন, দরজা খানিক খোলা। আমি রুমের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি ভেতর থেকে ডাকলেন, এই যে বিনয়ী মোহাম্মাদ জাকারিয়া...

তাঁর টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তর্জনী নির্দেশ করে চেয়ারখানা দেখিয়ে বললেন, বসো। বসলাম। 

চিকেন স্ট্যু খাচ্ছিলেন। আমাকেও খেতে বললেন। না করলাম। খাটো করে ধমক দিয়ে বললেন, খাও। 

প্রথম দিন তুমি আমার নাম-ধাম নিয়ে বলছিলে, তা তোমার নাম কি বিনয় মজুমদার রেখেছিলেন?

তিনি হাসার আগেই আমি হেসে দিলাম।

আহমদ জামান চৌধুরী, আজাচৌ, খোকা যেদিন শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন, সেদিন নায়করাজকে অঝোরে কাঁদতে দেখেছি। পর্দায় মা চরিত্রে অভিনয় করা শাবানাকে আমার আরেকটা মা মনে হতো, আর রাজ্জাককে বাবা। এমনটা মনে হয় সবারই হয় বা হতো।

আজাচৌ স্মরণ অনুষ্ঠানের দাওয়াত দিতে গিয়েছিলাম নায়করাজকে। খুব খুশি হয়েছিলেন। আজাচৌর ছাত্র বলে আমাদেরকে বিশেষ নজরে দেখলেন। অনুষ্ঠানের দিন-তারিখ শুনে জিভ কেটে বললেন, আহা! মুশকিল হয়ে গেল। আমার আগে থেকে ঠিক করা বিশেষ একটা প্রোগ্রাম আছে। মুশকিল হয়ে গেল...ভীষণ আফসোস করতে লাগলেন। তিনি নায়করাজ, কিংবদন্তি, তাঁর ভীষণ ব্যস্ততা, নানা প্রোগ্রাম থাকবে এটাই স্বাভাবিক। অথচ তিনি যে বিনয়ের সাথে আমাদের মতো লিটল বাচ্চাদের সাথে কথা বললেন, এ শুধু  বড় মানুষেরাই পারেন। ‘না’-ও যে এত সুন্দর করে, বিনয়ের সঙ্গে বলা যায় তা নায়ক রাজের মাঝে সেদিন দেখেছিলাম। দুজনের কেউই দুনিয়ায় নাই। 

আজাচৌ এবং নায়করাজকে যা বলা হয়নি 
আমার নাম রেখেছিলেন যিনি তাঁর নামও রাজ্জাক। না, নায়করাজ রাজ্জাক নন। আমার বড় মামা, আব্দুর রাজ্জাক মন্ডল।

আজ ২১ আগস্ট, প্রয়াণ দিবসে নায়করাজের প্রতি এ আমার সবিনয় নিবেদন।

এমএইচএস

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন